জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৬৬ বার সীমান্ত অতিক্রম করেছি

আট বোনের একমাত্র ভাই আমি। সবার আদুরে ছিলাম। বজরা হাই স্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কুখ্যত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত এবং আহতদের স্মরণে কর্মসূচী পালন করায় স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিলো আমাকে। তখন আমি পূর্বপাকিস্থান ছাত্রলীগের বজরা স্কুল শাখার সাধারণ সম্পাদক। এরপর উণসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় হরতাল কর্মসূচীকে সফল করতে বিপুলাসার রেলষ্টেশনের দক্ষিণের রেললাইন উপড়ে ফেলার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। ১৯৭০ সালে বেগমগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহবায়কের দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব পালন করি।

৭১’র ২২ এপ্রিল পাকিস্থানী আর্মিরা নোয়াখালীর নিয়ন্ত্রন নিলে মে মাসের শুরুর দিকে বেগমগঞ্জ থেকে প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম ব্যাচের সাথে চোত্তাখোলা হয়ে হরিণা ক্যাম্পে পৌঁছি যাই। সেখানে ১৫/২০দিন প্রশিক্ষণের পর দেশে ফিরে আসি। তখন আমরা যে ক’জন একসাথে ছিলাম তাদের মধ্যে আমি, মরহুম আহমেদ সুলতান (বজরা), মরহুম আবদুল হালিম (ছাচুয়া), মোজাম্মেল হোসেন বাচ্চু (কেশার পাড়), মরহুম আব্দুল ওয়াছেক মিন্টু (রামগতি) এবং মরহুম নুরুল ইসলাম (হাতিয়া) অন্যতম। আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল যুদ্ধকালীণ অবস্থার নিপুণ তথ্য সংগ্রহ ও সরবারাহ করা (Intelligence & Contact) । মুজিব বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনি, উপ-প্রধান আ স ম রব, রাজনৈতিক সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা মুজিব বাহিনীর প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের নির্দেশনায় আমাদের দায়িত্ব ছিলো যুদ্ধকালীন সময়ে ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং প্রশিক্ষন শেষে দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা, দেশের ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়া, যাতায়ত, চিকিৎসা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ‘জয়বাংলা’ লিফলেট বিতরণ এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের জন্য জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এ কাজগুলো করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৬৬ বার (যাওয়া আসা মিলিয়ে ১৩২ বার) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করেছিলাম। আজকের সময়ে এটি ভাবলে নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হয়। দেশ স্বাধীন করতে হবে, এই অদম্য ইচ্ছায়ই সেদিন সাহজ জুগিয়েছিলো।

৭১’র মধ্য আগষ্ট। ফজলুল হক মনি ও আ স ম আব্দুর রব এবং মোস্তফিজুর রহমানের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য কলেজ টিলা, আগরতলা থেকে রওনা হই। মেঘলা আকাশ, সারাদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। বেলা গড়িয়ে তখন ৪ টা কি ৫ টা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পার হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম। একটু দূরেই গুনবতি রেল ষ্টেশন গোডাউনে পাক আর্মি ও মিলিশিয়া ক্যাম্প। হঠাৎ আমাদের কানে আওয়াজ আসল “দুশমন যাতাহ্যায়” “দুশমন যাতাহ্যায়”। আমরা তখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পাশের গ্রামে ঢুকে পড়ি। কিন্তু বিধি বাম, পাঞ্জাবী আর মিলিশিয়াদের হাত থেকে রেহাই পেলেও রাজাকাররা আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে ধরে ফেলে এবং একটি গোয়াল ঘরে নিয়ে বেঁধে আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। বেলা গড়িয়ে ততক্ষণে অন্ধকার রাত নেমে এসেছে। তখন নিশ্চিত মৃত্যুরপ্রহর গুনছি। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছি। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমাদের বন্দী করার সংবাদ নিকটস্থ পাক সেনা ক্যাম্পে কেউ খবর দেয়নি এবং আমাদের শরীরও কেউ তল্ল¬াশী করেনি। এ পর্যায়ে আমাদের সহযোদ্ধা অসীম সাহসী ও বীরত্বের অধিকারী আহমেদ সুলতান তার শরীরে লুকায়িত চাইনিজ রিভলবার ব্যবহার করে মুক্তি পাওয়ার জন্য বারবার উদ্যত হচ্ছিলেন। তখন বোবার ভাষায় তাকে সংযত করি। এসময় আমরা ক্লান্ত,ক্ষুধার্ত ও মানষিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। নিশ্চিত মৃত্যু আমাদের শিয়রে। শত শত লোক আমাদের দেখতে সমবেত হয়েছে। তাদের সকলের বাকরুদ্ধ; চোখ মুখে বিষন্নতা। আমরা বাঁচার জন্য আকুতি মিনতি করছি এবং ভয়ে কাঁপছি। এর মাঝে হঠাৎ একটা নাম আমাদের কানে আসে “ লিডার, কুতুব ভাই আসুক”।

কে এই কুতুব ভাই? এই কুতুব উদ্দিন হলো ফেনী-লাকসাম এলাকার রাজাকার কমান্ডার। যে ছদ্মবেশে রাজাকার কমান্ডার হয়ে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করতো। মূলতঃ সে ছিলো মরহুম খাজা আহাম্মদ ও মরহুম শেখ ফজলুল হক মনির অনুগত লোক। ইতিমধ্যে  কুতুব উদ্দিন আমাদের আটক স্থানে পৌঁছে কৌশল হিসাবে আমাদেরকে গালমন্দ করতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি আমাদেরকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। ছাড়া পেয়ে আমরা গভীর রাতে কানকিরহাটের দক্ষিণ হাটির পাড়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রানপুরুষ মরহুম ডাঃ নুরুজ্জমান চৌধুরী সাহেবের বাড়ি পৌঁছি। তিনি আমাদেরকে পরম যতœসহকারে চিকিৎসা ও সেবাদান করেন। সুস্থ হয়ে আমরা মাতৃভূমি শত্রু মুক্ত করার জন্য আবার মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

দায়িত্ব পালনকালে ৬৬ ভারতে যাওয়ার মধ্যে শেষবারের মতো ৩ নভেম্বর আগরতলা থেকে উদয়পুর, বিশাল গড়, চোত্তা খোলা হয়ে গুনবতি দেশে ফিরে আসি। সেদিন আমাদের কাছে পাকস্থানীদের সাথে চুড়ান্ত লড়াই এবং বিজয়ের কিছু প্রাক ধারণা দেওয়া হয়েছিলো। যার কিছুদিনের মধ্যই আমাদের চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। বাংলার আকাশে পত পত করে উড়তে থাকে মানচিত্র খচিত লাল সবুজের পতাকা। আজো চোখের সামনে ভাসে দেশমাতৃকার জন্য জীবনবাজী রেখে লড়ে যাওয়া বীর সেনানীদের। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে যারা একটি পেশাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।

দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছি অনেক সহযোদ্ধাকে। অসংখ্য ঘটনা আজো মনের মধ্যে উঁকি দেয়। একেকটি ঘটনা একটি জীবন্ত গল্প। ক্ষুদ্র পরিসরে যা বর্ণনা করা সম্ভব হয়না। এখানে সংক্ষেপে কিছু স্মৃতিচারণ মাত্র। আগামি প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাঙ্খিত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিজ অবস্থান থেকে কাজ করবে, জীবন সায়াহ্নে এমনটিই প্রত্যাশা থাকবে।


গোলাম মোস্তফা ভূঁঞা

সাধারণ সম্পাদক

সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতি।


মন্তব্য লিখুন :