রণাঙ্গনের অচেনাপথে সম্বল ছিলো মায়ের কানপাশা

স্বাধীনতা বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবেচেয়ে বড় অর্জন। এই অর্জনের চূড়ান্তরূপ কেবলমাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে হয়নি। আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দীর্ঘপথের, ত্যাগের ফসল। জেল, জুলুম, জীবন, রক্ত, সম্ভ্রম, সম্পদ সবকিছুই বিসর্জন দিতে হয়েছে। সেই দীর্ঘপথে দুর্বাঘাসের মতো কোনমতে লেপ্টে ছিলাম আমার মতো ক্ষুদ্র এই মানুষটিও। যুদ্ধযাত্রায় মায়ের দেয়া কানপাশাকে সম্বল করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম রণাঙ্গনের অচেনা পথে। অগণিত টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো আজও যুদ্ধদিনের একেকটি জীবন্ত ইতিহাস মনে হয়।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমিই সবার বড়। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। যাকে বলা যায় সর্বহারা পরিবার। পরিবারের আর্থিক সহযোগিতার জন্য লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে শ্রম দিতে হতো। আর এজন্যই লেখাপড়ায় বেশ কয়েকবার ব্যঘাতও ঘটে। ছাত্রাবস্থায়ই বিশ্বাস করতাম আমাদের দারিদ্রতার জন্য ভাগ্য দায়ী! আর ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন ভগবান। তাই সুখ-শান্তি, দারিদ্রতা, ভাল লেখা-পড়ার জন্য ভগবানের অনুগ্রহ ও আশির্বাদ প্রয়োজন। ভগবানের সন্তুষ্টির জন্য ধর্মের প্রতি অনুগত ছিলাম। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান বিশ্বাসের সাথে পালনও করতাম। এই বিশ্বাসে ছেদ ঘটে ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণ আন্দোলন ও নেতাদের রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনে । বুঝতে পারি দারিদ্রতা, বৈষম্য এবং কুসংস্কারের জন্য দায়ী ভগবান নয়। পূর্ব বাংলার দারিদ্রতা, ধনবৈষম্য সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা সংকোচন, কুশিক্ষা ইত্যাদির জন্য দায়ী আমলাতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি দায়ী । এই অপশক্তিকে তাড়ানো না গেলে আমাদের দারিদ্রতা, স্বাস্থ্যহীনতা, লেখাপড়ার সমস্যা দূর হবে না। তাই পাকিস্তানি শোষন ও অপশাসন রুখে দিতে মিছিল, মিটিং, জনসভায় চলে যেতাম। খাওয়া-দাওয়া, পরিবার-পরিজন, লেখাপড়া কোন বিষয়েই চিন্তা ছিলোনা। শুধু চিন্তা একটাই, সাম্প্রদায়িক বৈষম্যসৃষ্টিকারী রাজনৈতিক অপশক্তিকে তাড়াতে হবে। এরা চলে গেলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসলেই বাঙালীদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যখন ভগবান থেকে বিশ্বাস সরিয়ে রাজনৈতিক শক্তির উপর বিশ্বাস আনলাম তখন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ভগবানের চেয়েও অনেক বেশী শ্রদ্ধা করতাম, বিশ্বাস করতাম। তখনও আমি শ্রেণী দ্বন্ধ, শ্রেণী চেতনা বুঝতাম না। বুঝতাম না সমাজতন্ত্র কি? বুর্জোয়া গণতন্ত্র কি?  

তখন বয়স ১৯ কি ২০ বৎসর, মেট্রিকে পড়ি। ৭১’র ২৫ মার্চ রাত্রে দেবতুল্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হয়েছেন। ২৬ মার্চ সকালে পাশের বাড়িতে গিয়ে রেডিওতে এখবর শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে-কাঁদতে বাড়ি ফিরলাম। ছেলের এই অবস্থা দেখে মা জানতে চাইলো কি হয়েছে ? জানালাম, পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি আর দেশে থাকবো না, ভারত যাব ট্রেনিং নিতে। আমি ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে যুদ্ধ করবো, বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধার করবো, দেশ স্বাধীন করবোÑ আমাকে টাকা দাও। মা বললেন আমরা গরীব, টাকা কোথায় পাবো ? আমার একটা কান পাশা আছে, নিয়ে যা। মগজে তখন যুদ্ধের নেশা, দেশ স্বাধীন করতে হবে। মায়ের দেয়া স্বর্ণের কানপাশা আমার একমাত্র সম্বল। সেই সম্বল নিয়ে পাশের বাড়ির বন্ধু পরেশ মজুমদারকে নিয়ে হেটে রওনা দিলাম। সেনবাগের কানকির হাটের ওপর দিয়ে  চৌদ্দগ্রাম ডিমাতলী দিয়ে ত্রিপুরা পৌঁছি। ত্রিপুরাতে ঢুকে সরাসরি ট্রেনিং এ যাইনি। হঠাৎ মাথায় চিন্তা এলো- অনেক খেলার সাথী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে ভারতে। এই সুযোগে তাদের একটু দেখা হবে,  কারণ যুদ্ধেতো মরেও যেতে পারি। মরে গেলে আর কারো সাথে কোন দিনও দেখা হবে না। তাই শেষবারের মত সবার সাথে দেখা করে নিতে পারবো।  একমাত্র মামা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়াতে বাড়ী ঘর করে আছেন। মা’র খুব অনুরোধ ছিলো একবারের জন্য হলেও মামাকে যেনো দেখে আসি। বড় কথা হচ্ছে মামাকে আমি জীবনেও দেখি নাই। তাই মামাকে দেখার ওছিলায় পশ্চিমবঙ্গে যাই। মামার বাড়ীতে থাকার ১৫ দিনের মাথায় একদিন না বলে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়ি।

রানার ঘাট শরনার্থী ক্যাম্পে তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে আগ্রহীদের তালিকা হচ্ছে। একজন ২৪/২৫ বছরের মেয়ে এবং একজন ৪৫/৫০ বছরের মহিলা তালিকা করছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমিও সেখানে ভর্তি হলাম যথাসম্ভব মে/জুনের দিকে। পরে নিয়ে যায় কল্যানী ইয়ুথ ক্যাম্পে, তাবু খাটিয়ে থাকার ব্যবস্থা হয়। থাকি আর প্রতিদিন প্যারট পিটি করি। রাত্র ৩টায় উঠি, ভোর রাত্রে রাস্তায় ডবল মার্চ করি। এভাবে তিন-চার’শ ছেলের দিন যায়। খাওয়ার মান ছিলো অত্যন্ত নিন্মমানের। পয়ঃনিস্কাসনের ব্যবস্থা ছিল না, ড্রেনে করা হতো। সকালের নাসতা  ছিলো রুটি-ডাল। আটায় বালু, ডাল পোকে কাটা, গন্ধ ভাত, পঁচা চাউল লেদা পোঁকা। আধা পেট খাওয়াও কস্টসাধ্য ছিলো। খাবার পানির খুব অভাব ছিল। অধিকাংশ ছেলের রক্ত আমশা হয়ে গেছে কিছুদিনের মধ্যেই। খোঁচ-পাঁচরা সম্পূর্ন শরীরে আমারও রক্ত আমশা হয়। সেকি দুর্বিসহ জীবনযাপন। এসব কিছুই তখন ব্যাপার মনে হচ্ছেনা, কারণ বুকে তখন যুদ্ধে যাওয়ার অদম্য বাসনা। এভাবে কিছুদিন গেলেও মূল ট্রেনিং এ পাঠাচ্ছেনা আমাদের। এনিয়ে ক্ষোভ জমছে মনের মধ্যে। মনে মনে বিড়বিড় করতাম- রোগ শোক খাওয়া নিন্ম মানের সব সহ্য করতে রাজি। ট্রেনিং দেন, অস্ত্র দেন যুদ্ধে যাই, দেশ স্বাধীন করতে হবেÑ এই ছিল প্রত্যাশা। এরই মধ্যে খাদ্য ও ট্রেনিং এর দাবিতে আন্দোলনের ফাঁকে ফাঁকে ২/৪ জন ছাত্র নেতাকে ভারতীয় আর্মিরা এসে মটর সাইকেলে করে নিয়ে যায় তাদের আর হদিস পাওয়া যায় নাই। শুনতাম তারা নকশাল। তাদের বক্তব্য থেকে শুনি মানুষের জন্ম সূত্রে ৫টি মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রতিটি শিশুর জন্ম হয়। সেটা হলো খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। আর এই অধিকারগুলো সংরক্ষণ করা যায় একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। সেই থেকে আমার সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের ধারণা জন্মায়।  

যাক; অনেক আন্দোলনের পর জুলাই/ আগষ্টে আমাদের প্রথম ব্যাচ ট্রেনিংএ পাঠানো হল। আমিও সেই ব্যাচে ছিলাম। ট্রেনিং এ যাওয়ার দিন একটি স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়না দেয়। ১০/১২ বছরের একটি ছোট্ট ছেলে, সে ট্রেণিংয়ে যাবেই। কিন্তু কমান্ডার বলছে তার পক্ষে এতো ছোট ছেলেকে ট্রেনিংয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাকে দিয়ে ট্রেনিং করানো যাবে না। কারণ ছোট থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকেও তো সে ছোট। কিন্তু ছেলেটি নাচড়বান্দা, সেই যাবেই যাবে। সেকি কান্না তার সেই ট্রাকের পিছনে ধরে ঝুলে ঝুলে কাঁদা, ট্রাক থেকে পড়ে গিয়ে পিছনে পিছনে দৌড়ানো, সেসব দৃশ্য ! অবশেষে আমরা সকলই কমান্ডারকে বাধ্য করলাম তাকে নিতে। তাকে নেওয়া হলো, ট্রেনিংও দেয়া হল। দেখা গেল সকলের চেয়ে বয়সে কম হিসেবে তার ট্রেনিংএ সব চেয়ে ভাল ট্রেনিং হয়েছে। বুঝলাম- জাতীয়তার চেতনা কত প্রকট হলে জীবন বাজী রেখে মানুষ ত্যাগের মহিমায় পাগল হতে  পারে। বর্ধমান জেলার পানাগড় ট্রেনিং সেন্টারে ১ মাস ট্রেনিং শেষে সবাই ফরিদপুর চলে যাই।

জীবনের এই পড়ান্ত বেলায়ও চোখ বন্ধ করলে বহু ঘটনা ভেসে উঠে। মনে হয় সকাল-সন্ধা এক নাগাড়ে বলে বা সারা দিন লিখেও শেষ করা সম্ভব নয়। যে ঘটনাটি না বললেই নয়- যথাসম্ভব অক্টোবরের মাঝামাঝি হবে। আমরা ক্যাম্প করছি। এক কৃষক জমিনের মাঝে নতুন বাড়ী করেছে পুকুর কেটেছে তিন টা। গাছ লাগিয়েছে, কিন্তু ঘর বাড়ী করে নাই। কারণ দেশে যুদ্ধ। সেদিন খুব সকাল, কৃষক প্রতিদিনের মত নতুন বাড়ী দেখতে গিয়ে প্রায়  শুকনো পুকুরের মাঝে ৭ জন সশস্ত্র পাকসেনা বসে বসে কাঁচা মুলা আর পেয়াজ খাচ্ছে। কৃষক চুপি চুপি গ্রামে ফিরে একথা বলামাত্র শত শত গ্রামবাসী ডাল, টুকরী, লাঠি নিয়ে পুকুরের চতুর্দিক ঘিরে ফেলে। শত শত লোক দেখে পাক সেনারা অস্ত্র চালানো ভুলে যায়। পরে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পাকড়াও করে। নিরস্ত্র মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ কত বেশী উদ্বুদ্ধ, মুক্তি পাগল, সেদিন মৃত্যু ভয় তাদের ছিল না। বিনা অস্ত্রে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

অক্টোবরের শেষ দিকে যুদ্ধ যখন তুঙ্গে। অনেকে ক্যাম্পে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি জন্ডীসে আক্রান্ত হয়ে মুমুর্ষ অবস্থায়। ক্যাম্পে থাকা ভারতীয় হাবিলদার রকবীর সিং আমাকে প্রথমে পানাগড় আর্মি হাসপাতালে ভর্তি করে। এক সপ্তাহ পরে অবস্থা খারাপ দেখে আমাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কলিকাতা আলিপুর কমান্ড হাসপাতালে রেফার করে। ৬ মাস হাপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা থাকলেও দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে ১১ জানুয়ারী আমরা ১১ জন, একজন এফ এফ আর্মি, ১০ জন ইপিআরসহ ১টি বাসে করে আমাদেরকে যশোর কেন্টনম্যান্টে পৌঁছে দেয়। রাতে আমরা সেখানেই ছিলাম। দরজা জানালা নেই, সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত বিল্ডিং। খুব ভোরে মানুষের হৈ চৈ শুনে বের হয়ে দেখি একটি পিকাপে একজন বড় বড় দাঁড়িওয়ালা হুজুর বাঁধা অবস্থায় আগেপিছে ৫০/৬০ জন পুলিশ। তার পিছনে শত শত মানুষ ছিল, মারছে হুজুরকে। জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে- আমবাগানে গিয়ে দেখেন এই পীরের কান্ড। আম বাগানে গিয়ে দেখি মানুষের মাথার টাল, মনে হয় যেন উত্তোলিত নারিকেলের খোলশ। 

অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু যে আশা নিয়ে আমরা যুদ্ধে করেছি, ৫০ বছরেও পুরণ হয়েছে কি সে আশা? বীরঙ্গনা পেয়েছে কি তার ইজ্জতের প্রতিদান? যে ২২ পরিবারের শোষনের বিরুদ্ধে ছিল আমাদের যুদ্ধ সে শোষণ কি আজও বন্ধ হয়েছে? বেকাার সমস্যার কি সমাধান হয়েছে গরীব কি এখনো চিকিৎসার সুযোগ পায়? সব শিশু, ছাত্র ফ্রি লেখা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে? সবার কি মাথা গোজার ঠাই হয়েছে? না, কোন প্রশ্নের উত্তর নাই। কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর। 

যুদ্ধকালীন সময় অসুস্থ্য ছিলাম বিধায়, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ৫০০ টাকার চেক ও একটি ধন্যবাদ পত্র নোয়াখালী সদর সিওডেব (বর্তমানে ইউএনও) এর কাছে পাঠায় আমার নামে । সেটি আনতে গেলে সিওডেব আমাকে বীরাঙ্গনা বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তখন আমি তার এমন প্রস্তাবে বলেছি বিয়ে করা উচিৎ, তবে আমার যেহেতু বিয়ে করার বয়স হয়নি, সুতরাং এখনই আমি বিয়ে করছি না। তারপর তিনি যোগ্যতানুসারে ৫টি চাকুরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যেটা আমার পছন্দ সেটাই আমাকে দেয়া হবে। আমি বলেছিলাম- দেশ স্বাধীন করেছি, সর্বস্তরের মানুষ সুখি হবে এমন প্রত্যাশায়। আমি ও আমার পরিবার সুখে থাকবে- এমন প্রত্যাশায় নয়। আমি চাকুরি করবো না, রাজনীতি করবো। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলে সকল স্তরের মানুষ সুখি হবে, ধনবৈষম্য দুর হবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ হবে; সেই দিন চাকুরী করবো। কিন্তু আমার আশাও পূর্ণ হলো না, চাকুরিও আর করা হলো না। আছি দীন-দরিদ্র বেশে। 

তারকেশ্বর দেবনাথ নান্টু
জেলা সমন্বয়ক, বাসদ (মার্কসবাদী)

মন্তব্য লিখুন :