নোয়াখালীতে রোপা আমনে ‘কারেন্ট’ পোকার আক্রমন

ধানের সঙ্গে ঝলসে যাওয়ার পথে কৃষকের স্বপ্ন

কারেন্ট পোকার আক্রমনে ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষেত দেখছেন একজন কৃষক। ছবি-প্রবাসে নোয়াখালী।

ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি এখন উপকূল জুড়ে। আমনের মাঠে সোনালী ধানের আভা ছড়িয়েছে। ঠিক এমুহুর্তেই মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। কৃষকের চোখের সামনেই সোনালী ধান ঝলসে যাচ্ছে রাতারাতি। একরের পর একরে ‘বিপিএইচ’ বা কারেন্ট পোকার আক্রমনে ক্ষেতের ধানের সাথেই ঝলসে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। কৃষিপ্রধান প্রধান নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ধানের মাঠে এমন চিত্রে আতংকি হয়ে পড়েছে কৃষককূল। এনিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ার আশংকায় দিশেহারা কৃষক অথচ কৃষি বিভাগ নিরুদ্বিগ্ন। উল্টো জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ক্ষেপেছেন সাংবাদিকদের ওপর।

এধরণের পোকার আক্রমন থেকে ফসল রক্ষায় একদিকে যেমন কৃষকের ধারণা কম তেমনি কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার স্বল্পতার কথাও বলছেন কৃষকরা। অথচ কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেও ক্ষতি কমানো যেতো এমন কথা কৃষিবিদদের। সরেজমিনে গেলে এমন চিত্র উঠে আসে।

সুবর্ণচরের চরজব্বার গ্রামের কৃষক সালা উদ্দিন রোপা আমন করেছেন আট একর জমিতে। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরছ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন- বর্তমানে দুটি জমি পোকার আক্রমণে শেষ হয়ে গেছে। প্রতিদিন পোকা ভিন্ন ক্ষেতে আক্রমণ করছে। এ বছর এ পোকা তারা প্রথম দেখতে পেয়েছেন। 

চর ওয়াপদা গ্রামের কৃষক মনির হোসেন জানান, তিনি এ বছর ৬ একর জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। শুরু থেকে ক্ষেতের ধান বেশ ভালোই বেড়ে উঠছে। এখন গাছে দুধ এসেছে। আর মাত্র ১৫-২০ দিন পরই এ ধান ঘরে তোলার কথা। হঠাৎ গত শনিবার ক্ষেতে গিয়ে দেখতে পান কিছু কিছু অংশের ধান ঝলসে গিয়ে মাটিতে মিশে গেছে। এমন অবস্থায় তিনি উপায়ন্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পর দিন কিছু কীটনাশকও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কোনো সুফলই মেলেনি। বরঞ্চ দুই দিনের মাথায় ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তার জমির ৩০ শতাংশ ধানই এখন ঝলসে গেছে।

শুধু ওয়াপদা বা চরজব্বারে নয়। এমন ভয়াবহ অবস্থা সুবর্ণচর উপজেলার মোহম্মদপুর, চরজুবলী, চর আমান উল্যাহ্, চরক্লার্ক, চর আক্রাম উদ্দিন ও চরবাটাসহ পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। একই অবস্থা হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ও হরণি ইউনিয়নেও। 

জেলার বেশিরভাগ জমির আমন ধানে কাইচথোড় থেকে দুধ গঠন অবস্থায় রয়েছে। ক্ষেতের ধানে অনেকটা সোনালি রঙ পড়েছে। আর মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন পরই এসব ক্ষেতের ধান উঠার কথা কৃষকের ঘরে। ধান নিয়ে স্বপ্নও বুনতে শুরু করেছে তারা। কিন্তু হঠাৎ গত এক সপ্তাহ ধরে ক্ষেতের ধানগুলো পুড়তে দেখা যায়। ঝলসে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জমির সোনালি ধান। একরের একরে জমির ধান এক সপ্তাহের মাথায় ঝলসে যাওয়ার দৃশ্য কৃষকের  সব কিছুকে শেষ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। ধানের সাথে ঝলসে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নও।

ধানের এমন অবস্থা সম্পর্কে কথা হয় স্থানীয় এনজিও সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার কৃষি কর্মকর্তা শিবব্রত ভৌমিকের সাথে। তিনি জানালেন- এটি মূলত ‘বিপিএইচ’ বা ‘কারেন্ট’ পোকার আক্রমন। যেসব উর্বর জমিতে একাধিকবার ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে, পাশাপাশি বৃষ্টির পানি জমাট বেঁধে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ তৈরি করেছে- সে জমিতেই মূলত এ পোকা সহজে বংশ বিস্তার করে এবং খুব দ্রত আক্রমন করে। পোকাগুলো সাধারণত ধানের কাইচথোড় থেকে দুধ গঠন অবস্থায় গাছের গোড়ায় আক্রমন করে কান্ডের রস চুষে ফেলে। এতে জমির ধান মহুর্তের মধ্যে ঝলসে যায়।

এ কৃষিবিদের মতে, কৃষক যদি উর্বর জমিতে ইউরিয়া সার একবারের বেশি ব্যবহার না করে এবং জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাকশনের ব্যবস্থা করে তাহলে এ পোকার আক্রমন থেকে রেহাই পেতে পারে। পাশাপাশি জৈবিক দমন যেমন- আলোক ফাঁদ ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রমন ঠেকাতে পারে। একই সঙ্গে জমিতে পোকার আক্রমণ দেখার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শক্রমে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। 

এদিকে সরেজমিনে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষকরা বলেন, এ মুহুর্তে তারা কি করবে তা খুঁজেই পাচ্ছেন না। কীটনাশক কোম্পানীদের কথামতো অনেক কীটনাশকও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ক্ষেতের আইলে মাঝে মধ্যে সরকারি কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা গেলেও তাদের কাছ থেকে মিলছে না সুপরামর্শ কিংবা সহযোগিতা। কৃষকদের মতে, কৃষি কর্মকর্তারা দক্ষতাসম্পন্ন নয়। ফলে ভালো পরামর্শও পাওয়া যাচ্ছে না তাদের কাছে। 

তবে; এসব তথ্য জানিয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কৃষি কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোকার এ আক্রমণের সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর টনক নড়েছে কৃষি বিভাগের। ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এমন মহামারি থেকে বাঁচতে কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিংও শুরু করেছে তারা।

কৃষকের এমন ঘোর বিপদ সম্পর্কে জানতে গেলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আবুল হোসেন। উল্টো তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। তারমতে  গণমাধ্যম কর্মীরা শুধু নেগেটিভ নিউজ বেশি প্রচার করেন। তাই তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি- এমন কথাই যেন লিখে দেন। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণের তথ্য মতে, ইংরেজি বছরের জুলাই মাসের শেষ থেকেই মূলত রোপা আমন আবাদ শুরু হয়। আবাদ শেষ হয় আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে। যা ক্ষেত থেকে কৃষকের ঘরে ওঠে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে। চলতি বছর পুরো জেলায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে রোপা আমন।

মন্তব্য লিখুন :