নোয়াখালীতে লবণাক্ত জমিতে আলু চাষের উজ্জল সম্ভাবনা

অনাবাদী জমি ঘুরিয়ে দিতে পারে কৃষকের ভাগ্য

নোয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে শুকনো মওসুমে লবনাক্ততার কারণে পড়ে থাকা বিপুল পরিমান অনাবাদী জমিতে আলুচাষের উজ্জল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কৃষকের একাগ্রতা, কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউটের প্রযুক্তি ও বীজ-সারসহ কৃষি উপকরনের সহায়তার ফলে ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে আলুচাষে সেই সাফল্য পেয়েছেন কৃষকরা। যারমধ্য দিয়ে লবণাক্ততা ও সেচ সংকটের কারণে শুকনো মওসুমে অনাবাদী পড়ে থাকা প্রায় পৌনে একলাখ একর অনাবাদী জমি ঘুরিয়ে দিতে পারে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য। যেখানে ফসল উৎপাদহীনতার কথা বলে মৎস খামারের নামে কৃষি খাসজমিও গো-গ্রাসে গিলছে প্রতাপশালীরা।

সরেজমিনে কৃষকদের মুখেই শোনা যান নতুন সম্ভাবনার সেই গল্পের কথা। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা ইউনিয়নের বাদামতলী এলাকার কৃষক মো. আমিন ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ১৪ শতাংশ জমিতে বারি উদ্ভাবিত ৯টি জাতের আলু আবাদ করেন । আবাদের ৮৫-৯০ দিন পরে গত বৃহস্পতিবার খেতের আলু উত্তোলণ শেষে পরিমাপ করে দেখেন ১৪শতাংশের ওই জমিতে প্রায় ৫০ মন আলু উৎপাদন হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইস্টিটিউটের নোয়াখালী সরেজমিন বিভাগ তাঁকে আলুর বীজ ও সার সরবরাহ এবং টেকনিক্যাল নানা সহযোগিতা প্রদান করে। কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিনি ওই জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আলু আবাদ করে সফল হয়েছেন। অথচ; এ অঞ্চলে বিগত কোনো সময়ে কোনো কৃষক আলু আবাদ করেনি। লবণাক্ত অঞ্চল বিধায় এখানে কখনও আলো উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। 

একই কথা শোনা গেছে কৃষক দিদাদের কন্ঠেও। দিদার কিংবা আমিন নয়। এভাবে অন্তত ১৪জন কৃষকের মাধ্যমে এক হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বারি উদ্ভাবিত বারি-৪১ ও বারি-৭২ জাতের আলু আবাদ করা হয়েছে। নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও পরিবর্তনশীল আবহাওয়া উপযোগি হওয়ায় এ আলুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। পরীক্ষামূলক চাষে আলুর ফলন ভালো হওয়ায় জেলার দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের মাঝে আলু চাষের দারুন সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান, বারির জেলা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমীর ফয়সাল। 

তিনি জানান, আলুর জাতভেদে কৃষক প্রতি শতাংশ জমিতে সর্বনিন্ম ১৫০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারেন। প্রতি শতাংশ জমিতে আলু আবাদ করতে কৃষকের সর্বোচ্চ খরচ হবে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। যা সর্বনিন্ম দরে বিক্রি হলেও কৃষক সকল খরচ শেষে প্রতি শতাংশ জমি থেকে ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারবে। 

গত বৃহস্পতিবার বিকালে নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও পরিবর্তনশীল আবহাওয়া উপযোগি আলুর জাতের উৎপাদন কলাকৌশল শীর্ষক এক মাঠ দিবসে এসব কথা জানান এ কর্মকর্তা। ওই দিন আলু চাষে সফল কৃষকদের পাশাপাশি আরো প্রায় ৭০জন কৃষক উপস্থিত ছিলেন। 

এ সময় কৃষকদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রাখেন, বারি নোয়াখালীর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মহী উদ্দীন চৌধুরী, জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। 

বক্তারা বলেন, নোয়াখালীর জমির বেশিরভাগই লবনাক্ত এবং এখানে সেচ সুবিধা নেই। ফলে আলু উৎপাদন সম্ভব হয় না। তবে লবণাক্ত ও তাপসহিষ্ণ জাত হওয়ায় কচুরিপানার ব্যবহার করে বারি-৪১ ও বারি-৭২ আবাদ সম্ভব। নিয়ম মেনে উৎপাদন করলে বারি-৪১ প্রতি হেক্টরে ৩০-৩৫ টন ও বারি-৭২ প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ টন উৎপাদন সম্ভব। এতে এ অঞ্চলের মানুষ ধান আবাদের পাশাপাশি নতুন করে আলু উৎপাদন করে নিজেদের আত্মসামাজিক অবস্থার আরো উন্নতি ঘটাতে পারে। 

এ সময় কৃষি সম্প্রসারণের কর্মকর্তা, বারি উদ্ভাবিত আলুর নতুন জাত সর্বস্তরের কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অঙ্গিকার করেন। 


মন্তব্য লিখুন :