নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ও এক কিংবদন্তীর মহাপ্রয়াণ

অধ্যাপক মোহাম্মদ হাসেম। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের প্রাণ ভোমরা। স¤্রাট, জনক নানা বিশেষনে বিশেষায়িত একজন গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত শিল্পী ও গবেষকের নাম। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে আঞ্চলিক গানের অনন্য উচ্চতার স্বতন্ত্র শ্রষ্ঠা তিনি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের গানের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে নোয়াখালীর গানকে একটি স্বকীয় স্বত্বায় দাঁড় করানোর পেছনে যে মানুষটি জীবনব্যাপি নিজেকে নিবেদন করে গেছেন। বলা চলে সিংহভাগ অবদানই এই গুণী গীতিকার. শিল্পী ও সুর শ্রষ্ঠার।  

মো. হাশেম ১৯৪৭ সালে নোয়াখালী সদর উপজেলার শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার পুরানা পল্টন লাইন হাই স্কুল, জগন্নাথ কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় তিনি ঢাকা সংগীত মহাবিদ্যালয় থেকে সংগীতে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন একই প্রতিষ্ঠানে। 

তাঁর সংগীতের প্রথম গুরু বাংলা লোকজ সংগীতের দিকপাল প্রখ্যাত শিল্পী আবদুল আলীমের হাত ধরে। তাঁর কাছেই প্রথম তালিম নেন সঙ্গীতের। এরপর ওস্তাদ বারীন মজুমদারের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত, ওস্তাদ আবিদ হোসেন খানের কাছে তত্ত্বীয় সংগীত, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খানের কাছে তবলায় দীক্ষা নেন। এরপর তিনি আঞ্চলিক, আধুনিক ও পল্লীগীতির চর্চা শুরু করেন। 

দীর্ঘ ৫০ পঞ্চাশ বছরের সংগীত সাধণার জীবনে শুধু নির্দিষ্ট আঞ্চলের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর গান, দেশের নানা অঞ্চলের মানুষের মন জয় করতেও তার রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানকে নিজের আলো’য় আলোকিত করে গেছেন। আঞ্চলিক ভাষায় দু’সহ¯্রাধিক অসংখ্য গান লিখেছেন তিনি। গানে গানে নোয়াখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য, কৃষ্টি, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ কিংবা গ্রামীণ জীবনের নানা চালচিত্র তুলে ধরেছেন গ্রামোফোন থেকে ক্যাসেট যুগ কিংবা তারও পরে ডিজিটাল যুগের সকল শ্রোতার কাছে। দেশে এবং বিদেশে রয়েছে তার গানের খ্যাতি। শুধু আঞ্চলিক ভাষায় নয়; তিনি অনেক পল্লীগীতি ও আধুনিক গানের রচয়িতাও। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় দুই হাজারের মতো গান লিখেছেন তিনি। শুধু  নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রায় পাঁচ শতাধিক আধুনিক ও পল্লীগীতি রচনা করেন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও লিখে গেছেন গান। তাঁর লেখা গান বাংলাদেশের আঞ্চলিক গানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ’নির্বাচিত নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান’ শিরোনামে তাঁর লেখা বই পাঠক সমাদৃত হয়েছে। এত কিছুর পরও শিল্পী মো. হাসেম জাতীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি পাননি। তবে লোকাঙ্গন শিল্পী গোষ্ঠী, শিল্পী মমতাজ আলী খাঁন পদক, নোয়াখালী জেলা শিল্পকলা পদক, নোয়াখালী সাংস্কৃতিক ফোরামের সম্মাননা পেয়েছেন। 

তাঁর জনপ্রিয় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হলো- ‘আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী, রয়েল ডিস্টিক ভাই’; ‘আঙ্গো উত্তুর বাড়ীর তারা, আঁডি-আঁডি বড় লোকের বাঁদে খালি বারা’; ‘ইদ্দুরিতান মাইজদী শহর এত লাগে বালা, যদিও নাই মাইজদী শহর হাঁচতলা দশতলা’; ‘হোনা কিয়া রুপা কিয়া হোনাত্তুনও খাডি, আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়াখাইল্লা মাডি’। এই গানগুলোর সুর সংগীত ও গায়কী ঢংয়ের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। তবে মৃত্যুর আগে গণমাধমে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি আশা এবং দুরাশার দোলায় বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের কাছে নোয়াখালীর গান এখনো অনেক জনপ্রিয়। তবে দুঃখের বিষয় হলো বর্তমান প্রজন্ম ভিনদেশি সংস্কৃতির অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের অঞ্চলের গানকে ভুলতে বসেছে। এই প্রবণতা রোধ করতে না পারলে এবং গানগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলে একদিন এই অঞ্চলের বিশেষ গান বলে আর কিছু থাকবে না। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ও মো. হাশেম যেন সমার্থক। তাই এ অঞ্চলের মানুষ মনে করেন তিনিই নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের স¤্রাট ও এক কিংবদন্তী। তাই তার পরিবারের দাবী যেন তার সকল সৃষ্টিকর্মকে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।

প্রয়াত এই মহাপ্রাণ নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের দীকপাল, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও গবেষক অধ্যাপক মো. হাসেমের মৃত্যুতে গ্রভীর সমবেদনা ও বিনীত শ্রদ্ধা। তাঁর সৃষ্টি বেঁচে থাকুক হাজার বছর।   

লেখক : 

জামাল হোসেন বিষাদ

কবি ও সংবাদশ্রমিক


মন্তব্য লিখুন :