অতিউৎসাহ নয়, চাই মানবিক আচরন

দেরীতে হলেও প্রণঘাতি করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে বাংলাদেশে। পুরো দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন।এরজন্য অনেকটাই দায়ী আমাদের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতা। এরসাথে জড়িয়ে আছে আমাদের নৈতিক অবক্ষয়, সম্পদের সীমাদ্ধতা, আচরণগত ত্রুটি। সবমিলিয়ে অতিউৎসাহ এবং উদাসীনতা আমাদের মজ্জাগত ব্যাপার রীতিমতো। এসব বিষয় নিয়ে ডিবিসি নিউজের নোয়াখালী প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান চৌধুরী কাজল তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটা স্ট্যাটাসে নিজের মতামত/পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। আবেগ এবং ক্ষোভ মিশ্রিত লেখনি অনেকেই শেয়ার দিচ্ছেন, মন্তব্য করছেন এবং প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। 

প্রবাসে নোয়াখালীর পাঠকদের জন্য তা নি¤েœ হুবহু তুলে দেওয়া হলো...

আচ্ছা যারা অলিতে-গলিতে, পাড়া-মহল্লায়, রাস্তার মোড়ে বা প্রধান সড়কে বাঁশ-গাছ বা অন্য কোন উপায়ে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন গায়ের জোরে বা রাজনৈতিক হ্যাডম (ক্ষমতা) ব্যাবহার করে, আপনাদের উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ। 

কিন্তু এটা কি ভাবনার মধ্যে আসছেনা যে, আপনার মানবিক কাজগুলো মানবিক বিপর্যয়ের কারন হতে পারে। যেমন- চিকিৎসাসেবা, জরুরী পরিসেবা, দৈনন্দিন খাদ্য সংগ্রহ, মানুষের বিপদে-আপদে। এগুলো করে যে আপনি নিজেই আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন ও অপরাধ করছেন, এটা কি মাথায় আসছে না? অকারণে চলাচল বন্ধ করার কাজটি যে আরো মানবিকভাবে ও দৃষ্টিনন্দনভাবে করা যায় তার বহু উদাহরণও ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন রাস্তায় খালি যানবাহন দেখলেই অনেক চালকের সাথে খারাপ আচরণ করছেন। আপনারা কি আগে নিশ্চিত হচ্ছেন যে, এরা খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, রোগী বা কোন জরুরীসেবার কাজে নিয়জিত নয়? সরকার এ সেবাগুলোতো চালু রেখেছেন। তবে অকারনে রাস্তায় বের হলে অবশ্যই শাস্তির আতওতায় আনা। 

কেউ কেউ রাস্তায় মানুষ দেখলেই খারাপ আচরণ করছেন। আপনারা কি আগে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এ মানুষগেুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমস্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আপনার, আমার ও রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখার জন্য রাস্তায় বের হয়েছেন। তার জন্য দরকার আপনার মানবিক সহযোগিতা, সুযোগ থাকলে তার গন্তব্যেকে সহজ করা, প্রয়োজনে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া। 

আর আমরা যারা প্রতিনিয়ত অকারনে রাস্তায় বের হচ্ছি এবং রাষ্ট্রে আইন লঙ্গন করছি, আমাদের কি এখনো মানবিকবোধ গুলো জাগ্রত হয়নি? জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে আমাদের প্রশাসন, চিকিৎসাসেবা কাজে নিয়োজিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, জরুরীসেবা কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টরা দিনরাত অবিরাম প্ররিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ মানুষগুলোর জন্য কি একটুও মায়া হয় না আপনার? 

করোনায় যখন কোন মানুষ মারা যায়, তখনো আপনি, আমি পালিয়ে যাই, কবর দিতে বাধা দিই। ঠিক সে সময়েও জীবনের সর্বোচ্ছ ঝুঁকি নিয়ে এ কাজগুলো প্রশাসন ও পুলিশ ভাইয়েরাই করে থাকেন। অন্তত এ সময়গুলোতে এসব মানুষগুলোর প্রতি আপনার শ্রদ্ধা ও সমর্থন থাকা উচিৎ নয়কি?

রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং অপ্রয়োজনে রাস্তায় বের হয়ে কেন তাদেরকে অকারনে হয়রাণি করছেন? কেন তাদের কষ্টকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছেন? কেন আপনার অপ্রয়োজনে বের হওয়ার খেসারত যারা প্রয়োজনে বের হচ্ছে তারা দিতে হচ্ছে? 

পৃথিবীর সব দেশের প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিতরা তাদের নাগরিকদের সাথে কি ধরনের কঠিক ব্যবহার করছেন সেটা আপনারা মিডিয়ার মাধ্যমেই অবগত হয়েছেন। আমাদের রাষ্ট্র এ দুর্যোগের

 সময় জনগণের সাথে মানবিক আচরণ করতে বলেছেন। তার অর্থ কি রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলা? আমরা চাই প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি মানবিক আচরণ করুক। এ কঠিন সময় আমাদের আচরণ যেন অন্যের ক্ষতির কারন না হয়। 

আর একটি বিষয় মনকে কঠিন কষ্ট দিচ্ছে কিছুদিন ধরে। সেটা হলো অসহায় মানুষের রিজিকের ওপর যারা কালো থাবা বসিয়েছেন। করোনায় তাদের মৃত্যু হবেনা এরকম নিশ্চয়তা তারা কোন না কোনভাবে হয়তো নিশ্চয় পেয়েছেন। খিদের অভাবে গরীব অসহায় মানুষ মৃত্যু পথযাত্রি হচ্ছে, আর তুই তার খাবার চুরি করছিস। তোর চেয়ে নিকৃষ্ট অমানুষ আর পৃথিবীতে কে হতে পারে। তবে মানুষ বুঝেছে তুই শুধু দেশদ্রোহী না, তুই করোনার চেয়েও ভয়ংকর। মনে রাখিস, যদি কোন দিন এ রাত্রি ভোর হয়, তোর মতো নর্দমার কিটকে এর হিসেব কড়ায় গন্ডায় দিতে হবে।

প্রাণঘাতী এ দুর্যোগ মোকাবেলায় পৃথিবীর ক্ষমতাধর ও সবদিক থেকে উন্নত রাষ্টগুলোর নাজুক পরিস্থিতি দেখে আমাদের যদি এখনো হুশ না হয়, এখনো যদি আমরা আমাদের রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা না বুঝি, এখনো যদি শুদ্ধ আচরণ না করি, তাহলে আসুন আমারা হিংশ্র হয়ে উঠি, কোন কিছুর তোয়াক্কা না করি, একে অপরকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাই।

তারপরও আশাহত হতে চাই না, আমি সব সময় আশাবাদী মানুষ। এখনো যেটুকু সময় আমাদের হাতে আছে, আমরা যেন তার সঠিক ব্যবহার করি। আমি বিশ্বাস করি নিশ্চয় এ অন্ধকার কেটে যাবে, সুস্থ ও সুন্দর ভোরের আলো ফুটবেই। নতুন আলোয় ধরনী হবে মানুষ ও প্রকৃতির সবচেয়ে বসবাস উপযোগী।

সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন।


নোয়াখালী প্রতিনিধি, ডিবিসি নিউজ।


মন্তব্য লিখুন :