নোয়াখালীতে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি কতটুকু ?

করোনা ভাইরাসের সংক্রমন প্রতিরোধে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে নোয়াখালীর প্রশাসন। গত প্রায় একমাস ধরে জনগণকে সচেতন করা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ও খাদ্য সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান, খাবার দোকান ও কারখানায় অভিযানসহ নানান পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেনেন্সে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করার সুযোগে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের বায়েলজিক্যাল ল্যাবে মেশিনপত্র স্থাপন করে করোনা সনাক্তকরণে পূর্ণাঙ্গ ল্যাব স্থাপনের কথাও অবহিত করেছেন জেলা প্রশাসক। পরদিন যথারীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভ্যানশন-সিডিসি) চার সদস্যের একটি দল এ ল্যাবও পরিদর্শন করেন।

ইতোমধ্যে ১১ এপ্রিল থেকে নোয়াখালীকে লকডাউনও ঘোষণা করা হয় এবং তা বাস্তবায়নে কাজ করছে জেলা উপজেলা প্রশাসন। এত্তোসব বর্ণনা দিলাম তারপরও শিরোনামটুকু এমন কেনো ? যে কেউ এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন। আমরা জানি করোনা সংক্রমনে ইতোমধ্যে নোয়াখালীতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, আক্রান্তও আছে। দলে দলে নারায়নগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন চুপিচুপি বাড়িতে এসেছে। যেটি এতোদিন প্রবাসীদের বেলায় ভয় ছিলো। বলে রাখি শুধু জেলা প্রশাসকের তথ্য মতেই গত ক’মাসে প্রবাসী এসেছে প্রায় ৩০ হাজার এর বাইরে আরো কতো এসেছে কে জানে ?

অথচ; প্রশাসন এখনো দৃশ্যত খাদ্য সামগ্রী তথা ত্রাণ তদারকি ও বিতরণে ব্যাস্ত সময় পার করছে। এটি নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু “করোনা” পেটের ক্ষুধার সাথে যতোটুকু জড়িত তারচেয়ে অনেক বেশী মানুষের জীবনমরণের সাথে জড়িত। সেক্ষেত্রে সচেতনতা প্রচারণা পাশাপাশি প্রস্তুতির বিষয়টিও বিবেচনায় আনা জরুরী। করোনায় সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসার জন্য কোন কোন হাসপাতালে কতগুলো বেড, কতগুলো বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। সেসব জায়গায় চিকিৎসার সুযোগ কতটুকু, চিকিৎসা সামগ্রীর সহজলভ্যতা রয়েছে কিনা, চিকিৎসাসেবা প্রদানের সাথে সম্পৃক্ত প্রয়োজনীয় চিসিৎসক, নার্স কিংবা সেবাদানকারীদের মানসিক প্রস্তুতি কতটুকু। এক্ষেত্রে জেলায় ইতোমধ্যে অবসরে যাওয়া চিকিৎসক, চিকিৎসা সহকারী, নার্সদের তালিকা রয়েছে কিনা ? তাঁদের আহবান জানানো হয়েছে কিনা। পর্যাপ্ত ওষুধের মওজুদ আছে কিনা এবং পর্যাপ্ত আর্থিক তহবিল রয়েছে কিনা ? এমন অসংখ্য তথ্য থাকা জরুরী।

এই অবস্থায় করোনা যদি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটকু ? এই প্রশ্নটিই এখন সামনে চলে এসেছে বারবার। ফেসবুকে এসংক্রান্ত পোস্টগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। অনেকে মন্তব্য করেছেন জেলা পর্যায়ে জরুরী সভা করে প্রয়োজনী সিদ্ধান্ত নিতে। তাঁরা জানতে চায় প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটুকু। কারণ করোনা পরিস্থিতিতে জনসাধারণ তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (দিনে রাতে মিলিয়ে) যোগ্যতা এবং সামর্থ্যরে বিষয়টি অনুমান করেছে। নেতেৃত্বের দেউলিয়াত্বে নোয়াখালীর জনগণ তাকিয়ে আছে প্রশাসনের দিকে। যে ক’জন জনপ্রতিনিধি মাঠে জনগণের পাশে রয়েছেন তাঁরা সাধুবাদ পাচ্ছেন। বাকীরা আত্মগোপনে। এখানে প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোন প্রয়াস নেই।

এবার আসি তাহলে কি প্রশাসন সকল প্রস্তুতি চুড়ান্ত করে ফেলেছে ? না এমনটি তন্ন তন্ন করেও জেলা প্রশাসকের ব্যাক্তিগত এবং ডিসি নোয়াখালীর ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়নি রোববার মধ্যরাত পর্যন্তও। অথচ গত ৮ এপ্রিল ফেসবুকে ডিবিসি নিউজের নোয়াখালী প্রতিনিধি কাজল চৌধুরীর একটি পোস্টে কমেন্ট করে জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস লিখেন “ইতিমধ্যে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছি, আশাকরি খুব শীঘ্রই একটা ব্রিফিং গণমাধ্যমে দেব”। জেলা প্রশাসকের এই মন্তব্যে অভিব্যক্তি দিয়েছেন ১৪ জন এবং পছন্দ এবং ভালোবাসা দেখিয়েছেন ৩৭জন। কিন্তু গত চারদিনেও সেই ব্রিফিং কিংবা ফেজবুক পেজে কোন প্রস্তুতির তথ্য মিলেনি।

ধরে নিচ্ছি জেলা প্রশাসনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। নাগরিক হিসাবে যে কারে সেই প্রস্তুতিটুকু জানারও অধিকার রয়েছে। কারণ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যার্থ হলে তখন যদি কোন তথ্য হাজির করা হয় সেটি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। নোয়াখালীর জেলা প্রশাসকের সাথে সিভিল সার্জনের কাজের অপূর্ব সমন্বয়ের চিত্র দেখেছি আমরা গত কিছুদিন ধরেই। আশাকরছি এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ন্যুনতম একটা প্রস্তুতি দৃশ্যমান হবে। আমরা স্বীকার করি আমাদের সীমাবদ্ধতা, সম্পদ ও জনবলের অপ্রতুলতার বিষয়টি। কিন্তু আমাদের মেধা এবং পরিশ্রম করার সক্ষমতা পৃথিবীর অন্যকোন জাতির চেয়ে কম নয়। এখনো পরিস্থিতি অতোটা ভয়ানক রূপ ধারণ করেনি সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তার সুযোগ রয়েছে। ঘাটতি থাকলে সেটি পূরণে পদক্ষেপ নেওয়াটা জরুরী।

নোয়াখালীতে স্বাস্থ্য কিংবা নাগরিক পরিসেবা নিয়ে অসংখ্য ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠান সুনামের সাথে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসকল ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে, এড়িয়ে চলে। কারণ দাম্ভিক জনপ্রতিনিধি আর কথিত নেতারা মনে করে সেই সকল ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠান আবার প্রাধান্য পেয়ে যায় কিনা। গত ১১ বছরে তাদের সাথে বসতে অনেকের গোঁড়ামি ছিলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে, স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে, লোকবল রয়েছে এমন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাথে নিয়ে জেলা পর্যায়ে দূযোর্গ/মহামারি মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। মতামত নেওয়া যেতো পারে না শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদেরও। এই সংকটকালীন সময় মোকাবেলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরী।

নোট: অনেক সংবাদকর্মী মনে করেন জেলা প্রশাসন কিংবা সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পরামর্শমূলক লেখা কিংবা ফেসবুক পোস্টকে বিরোধীতা মনে করেন।


মন্তব্য লিখুন :