করোনার নমুনা পরীক্ষা নোবিপ্রবিতে নয় কেন ?

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের থাবা থেকে যখন নিজ সামর্থ্য দিয়ে লড়ার বিষয়টি অগ্রাধিকা বিবেচ্য হওয়া কথা তখন নোয়াখালী হাটছে উল্টো পথে। করোনা পরিস্থিতিতে পদে পদে শুধু নাই নাই করা হচ্ছে, সম্পদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে একটি পক্ষ। গণমাধ্যমকর্মীদেরকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখে সেই সামর্থহীনতার দিকে। অথচ নোয়াখালীতে করোনা পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ল্যাব আছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালযের(নোবিপ্রবি) মাইক্রোবায়েলজি বিভাগে। সেখানে পরীক্ষার উদ্যোগ না নিয়ে শুধু নোয়াখাালী মেডিক্যাল কলেজে পূর্ণাঙ্গ ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে অযথা সময় ক্ষেপন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষ সমূহের সমন্বয়হীনতা না কোন পক্ষের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে সেটি খতিয়ে দেখা জরুরী।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে তখন পূর্ণাঙ্গ ল্যাব থাকা স্বত্ত্বেও একই পরীক্ষা নোবিপ্রবিতে নয় কেনো সেই প্রশ্ন উঠেছে। ইতোমধ্যে নোয়াখালীতে মারা গেছেন ৫জন। দুইজন মারা যাওযার পর করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসে, একজনকে গোপনে সৎকার (দাহ) করা হয়। বাকী দুইজনের তথ্য এখনো আসেনি। পজিটিভ আসা ৩ রোগী বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। অর্ধেকেরও বেশী নমুনার ফলাফল জানা যায়নি। অথচ ন্যুনতম সিদ্ধান্ত এবং কীট হলেই নোবিপ্রবিতেই করোনার নমুনা পরীক্ষা করা যেতো।

সেটি করা না হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নোবিপ্রবির আরটি-পিসিআর মেশিন এনে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ল্যাবটিও দ্রুত চালু করা সময়ের দাবি। বায়োসেফটি সিস্টেমস্ স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজের বায়োলজিক্যাল ল্যাবটি চালু করে দ্রুত করোনা নমুনা পরীক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে।

নোয়াখালীতে করোনা সংক্রমন নিয়ে গত ২৩ এপ্রিল ”নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে দেরি; বাড়ছে উৎকন্ঠা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৬৩৮জন সন্দেহভাজ ব্যাক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তন্মধ্যে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ২৯৫টি নমুনার ফলাফল জানা গেছে। এতে কোভিড-১৯ পজিটিভ এসেছে মাত্র ৪জনের। নোয়াখালী থেকে নমুনার অর্ধেকেরও বেশী পরীক্ষার জন্য পড়ে আছে চট্টগ্রামের বিআইটিআইডিতে। 

নিঃসন্দেহে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে পূণাঙ্গ ল্যাব স্থাপন জরুরী, তারচেয়েও জরুরী ছিলো নোবিপ্রবির মাইক্রোবায়েলজি বিভাগে পরীক্ষা চালু করা। কোন একটা পক্ষ হয়তো বলবেন তাঁরা জানতেন না অথবা তাঁদেরকে বলা হয়নি। সেই সুযোগটিও নেই। কারণ সরকারের সর্বোচ্ছ পর্যায় জানে দেশের কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাক্রোবায়োলজি বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ল্যাব আছে, কোথায় পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। নোবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ তাদের সামর্থের কথা শিক্ষা মন্ত্রনালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জানিয়েছেন। জানেন নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক এবং নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষও। 

গত ৩১ মার্চ আবেদন করেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সালাম স্বাস্থ্য অধিপ্তরের ডিজি বরাবরে আবেদন করেছিলেন মাইক্রোবায়েলজি বিভাগের জন্য আরটি-পিসিআর মেশিন, টেস্ট কীট ও সুরক্ষা সামগ্রীর জন্য। কলেজের অধ্যক্ষ ও স্বাচিপের সভাপতির উপস্থিতিতে গত ১৬ এপ্রিল নোবিপ্রবিকে কাজে লাগিয়ে করোনা নমুনা পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এর প্রতি ফাইল নোট দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তখনো মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়েলজি বিভাগে বায়ো সেফটি সিস্টেমস্ নাই। সেটি আছে নোবিপ্রবির ল্যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি তখন বলতে পারতেন নোবিপ্রবিতেই পরীক্ষা শুরু করার জন্য।

শুরুর কথা-

গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেন্স চলাকালে জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস করোনায় আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে পূর্ণাঙ্গ বায়োলজিক্যাল ল্যাব স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরদিন ৮ এপ্রিল বুধবার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভ্যানশন-সিডিসি) চার সদস্যের একটি দল এ ল্যাব পরিদর্শন করেন। দিকে ৯ এপ্রিল  নিজেদের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ল্যাবে করোনা স্যাম্পল পরীক্ষার আগ্রহ দেখায় নোবিপ্রবি। 

হিসাব মিলিয়ে নিতে পারেন-

নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজে ল্যাবের জন্য আরটি-পিসিআর মেশিন ও বায়ো সিস্টেমস্ বসানো জরুরী। শুরু থেকে গণমাধ্যম কর্মীদের দৃষ্টি সেদিকে ফিরিয়ে রাখা হয়। শুরু থেকে নোবিপ্রবি তাঁদের সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে আসেনি। জানানো হয়নি গণমাধ্যমকেও। অথচ নোবিপ্রবি এবং নোয়াখালী মেডিক্যালে কলেজ উভয় কর্তৃপক্ষই বিষয়টি জানতেন। নোবিপ্রবির মেশিন পত্র মেডিক্যাল কলেজে গেলে সেটি ফেরৎ আসা এবং এক্ষেত্রে তাঁদের গবেষণার কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা জায়গা থেকে তাঁরা বিষয়টি চেপে যেতে পারে। এই চেপে যাওয়ার ফলে নোয়াখালীতে করোণা সংক্রমিতদের নমুনা পরীক্ষায় ধীর গতি।

এদিকে নোয়াখালী আব্দুল মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজের নাই নাই’র মধ্যে ১২ বছর পেরিয়ে গেছে। হাসপাতাল নির্মাণেরও কোন পদক্ষে নেই। কলেজ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক্ষেত্রে চরম ব্যার্থতা ও উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের কখনো উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায়না অবকাঠামো দাবিদাওয়া নিয়ে। আমরা চাই দ্রুত নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়েলজি বিভাগের ল্যাবে আরটি-পিসিআর মেশিন স্থাপনের মধ্য দিয়ে ল্যাবটি পূর্ণাঙ্গতা পাক, প্রতিষ্ঠিত হোক হাসপাতালও।

প্রসঙ্গত: করোনা পরীক্ষার কীট তৈরীতে নোবিপ্রবির দুইজন কৃতি শিক্ষকের সাফল্যের বিষয়টিও জেনে গেছে দেশবাসী। তারাও ব্যাবহার করেছেন এখানকার ল্যাব।

দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরী-

১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আদেশের পরও ১০দিন পেরিয়ে গেছে। এরই মধ্যে কীঠ হলেই নোবিপ্রবিতে পরীক্ষা করা যেতো। নোবিপ্রবির ল্যাবটি পরিদর্শনের পর বর্তমানে লেবেল-২ এ থাকা বায়োসেফটি সিস্টেমের আপগ্রেডের প্রয়োজন হয় সেটি দ্রুত করে সেখানে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ইতমধ্যে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে শনিবার ৮ম দিনে চার জেলার ৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৭ জন কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে।

দ্রুত কীট সরবরাহের মাধ্যমে নোবিপ্রবির ল্যাবে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা শুরু করা যেতে পারে। একই সাথে মেডিক্যাল কলেজের ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি দ্রুত গতি যেনো পায় সেক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জেলা প্রশাসন ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। কারোমধ্যে যদি আত্মসম্মানের ফারাক থাকে সেটি ঘুচিয়ে জনসাধারণের পক্ষে এগিয়ে আসা জরুরী।


এই সংকটকালে কোন লুকোচুরি কিংবা কারো ব্যাবসাপাতির স্বার্থ বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে হুমকির মুখে ফেলবে। নোবিপ্রবি নাহয় নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ যেখানেই হোক সীমিত সম্পদ দিয়েই আমাদেরকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে করোনা নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে।


মন্তব্য লিখুন :