সাহস হারালেই শেষ, মরণের উল্টোপিঠে বাঁচিবার সুঘ্রাণ

করোনায় সংক্রমিত হয়ে একা একঘরে লড়ে গেছেন মরণঘাতি করোনার বিরুদ্ধে। পরীক্ষা করিয়ে ফলাফল পজিটিভ আসার পর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ, ঘরে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র রাখা, নিজের মনোবল অটুট রাখা, নিয়মিত পরিচর্চা, ওষুধ সেবন, পরিচ্ছন্ন থাকা সর্বপরি সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় করোনা সুস্থ হয়ে উঠেছেন সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান গুরু। সুস্থ হয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে করোনা জয়ের সেই গল্প লিখেছেন এনটিভির সিনিয়র করসপন্ডেন্ট  মাহমুদুল হাসান গুরু


কফিনের অন্দর থেকে কাফন মোড়ানো হিমকন্ঠে,কে যেন কতকাল পর হাঁপর টানা কষ্টে ডেকে যায় ...

শশ্মান, গোরস্তানে নিঃসঙ্গ, চুপচাপ কর্পুরের ঘ্রান ছড়ানো কষ্ট। দমে দমে যেন যমের আসাযাওয়া। তবুও সংগ্রাম চলে, পৃথীবির মানুষের ভালোবাসা আমার অসুখে মলমের প্রলেপ এঁকে, সুস্থতার পথে টেনে নিয়ে এসেছে।

একাকি কালো আঁধার পেরিয়ে সুবেহ-সাদিকের বর্ণ রেখায় আমি পেয়েছি পৃথীবির পথ হাঁটবার আলো। নিতান্তই ক্ষুদ্র মানুষ আমি। এই যন্ত্র নগরীর এককোনে একাকী সংসার গড়ি। মাথার ভেতর সংবাদের নেশাটা লেপ্টে আছে বলে তার জড়াজড়ি থেকে নিজেকে পৃথক করতে পারিনা। খুব নামকরা কেউ আমি নই। হাসান মাহমুদ নাম। লোকে ' গুরু ' নামে চেনে বেশি। সংবাদে আছি বলেই, চীনের উহান থেকেই করোনাকে জানতে শুরু করি। করোনার ছোবলে মরছে মানুষ, বাড়ছে লাশের সারি,পৃথীবি জুড়ে বাড়ছে চোখের জলের ঘনত্ব। মানুষের কোলাহলে মুখরিত বিশ্ব নিশ্চুপ হলো বেদনার আহাজারিতে। দেশ থেকে দেশ বিচ্ছিন্ন হতে সময় নিলোনা বেশি। আতংক আর উদ্বেগের দিন গুনতে গুনতে সীমানা পেরিয়ে দেশেও হানা দিলো কোভিড-১৯ এর কালো থাবা। সংবাদের শ্রমিক আমি। তাই ভয়ের চোহদ্দি পেরিয়ে করোনা কালেও দৌড়াই মাঠে। কি এক যুদ্ধ যুদ্ধ দিন। কফিন আর লাশ গোনাই যেন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন লাশের সংখ্যা গুনে শংকা নিয়ে ঘরে ফিরি।  ঘর কোথায়? দু'কামরার ভাড়া বাসা, একাই থাকি ঘরে একলা মানুষ। মাথার মধ্যে করোনা, লকডাউন, মৃত্যু, লাশ এসব নিয়েই রাতের বিছানায় চোখ মুদি। ভাবি এই বুঝি করোনার করাল থাবা গ্রাস করলো। দেরী হলোনা, অবশেষে কোভিড-১৯ ঠিকই কামড়টা বসলো আমার শরীরে । দ্বিতীয় রোজায় ঘরে ফিরে শরীর ব্যাথা, গায়ে জ্বর বোধ হচ্ছে। ঘরে আমি একজন মাত্র মানুষ থাকি। কাউকে শরীর খারাপের এই কথা বলারও নেই। আর ঢাকার বাড়িতে প্রতিবেশি মানে অচেনা মানুষ। ব্যস্ততায় দেখিওনি কখনো তাদের। রাতের সাথে জ্বরের মাত্রাও বাড়লো।  থার্মোমিটারে জ্বর তখন ১০০। সংবাদের কারনে করোনায় করনীয় যা যা জানি সেঅনুযায়ী গরম পানির ব্যবহার শুরু করলাম। নাপা খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মাথার চারপাশে চিন্তার কামড়। মনে অনায়াসে ভয় ঢুকে পড়েছে হুহু করে। ঘুম হয়নি তেমন, সেহরিতে উঠে দেখি গা কাঁপছে। জ্বর বাড়ছে। পুরোদিন গেলো ১০১ জ্বর নিয়ে। আমি ঘরে একা। হোটেল বন্ধ লকডাউনে। চলছে রমজান। জ্বর নিয়ে নিজেই খিঁচুড়ি রেধে রাখলাম আর ডিমসেদ্ধ। সুস্থ হবার তাগিদ অনুভব করলাম। গরম পানি লেবু আদা,কালোজিরা, লবঙ্গ,মধু জলে গার্গল করছি। সেই তপ্ত জল চায়ের মতো খেয়ে যাচ্ছি। জ্বর আরো বেড়ে ১০২ হলো। বড় ভাই ডাক্তার নূরুল আমিন৷এক নিভৃতচারী চিকিৎসক। রাজধানী থেকে পড়াশোনা শেষে গ্রামের মানুষের সেবায় কাজ করেন দূরের শহরে। ফোন দিয়ে তাঁকে জানালাম বৃত্তান্ত।ওষুধ লিখে পাঠালেন মুঠোফোনে। গা কাপা জ্বর আর সুরক্ষা নিয়ে চারতলা ডিঙ্গিয়ে নিজেই আনলাম ওষুধ।

জানালাম নিজের কর্মস্থল এনটিভিতে। সবাই সহমর্মিতা জানিয়ে পাশে থাকার সাহস জোগালো। ক্রমেই জ্বর বেড়ে চললো। রাতের আঁধার কিংবা দিনের আলোর এখন আর তেমন ব্যবধান দেখিনা। তীব্র জ্বরের ঘোর। চতুর্থ দিনে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর থার্মোমিটারে। এই নি:সঙ্গ ঘরে, একাই চলতে লাগলাম।খিচুড়ি করি, ডিম ভাজি, জ্বরের ঘোরে বিছানায় পড়ে থাকি সংজ্ঞাহীন। ফের সংজ্ঞা ফিরে এলে,গরম জলে ভাপ নেই। রসুন,আদা,কালোজিরা, সরিষার তেল,লবঙ্গ,লেবু একসাথে সিদ্ধ করে সে জলের ভাঁপ নাক দিয়ে টানছি ফুসফুসের দিকে। কিছুটা ঘেমে জ্বর ছাড়ে। প্যারাসিটামল, এন্টিবায়োটিক চলে সমানতালে। ডাক্তারের সাথে ফোন ও মেসেঞ্জারে চলছে যোগাযোগ। তীব্র জ্বর, নিজের খাবারের প্লেট হাড়ি ধুয়ে রেখে শরীর ফেলে দেই বিছানায়। মনে করোনার ভয়,ভাবি বেঁচে থাকতে হবে। ভাবি এই দুসময় কাটিয়ে আবারো সংবাদের মাঠে ফিরতে হবে। কতো কতো কাজ বাকি। দিন যায়,জ্বরের সাথে যোগ হয় তীব্র গলাব্যাথা, খুশখুশে কাশি৷ যেন চাকু দিয়ে গলা কাটার কষ্ট। কোভিড-১৯ টেস্ট করে ফলাফল এলো 'পজেটিভ'। ভয়ের পারদ আরো বাড়লো একলা ঘরে। বাড়িতে জানালাম, স্বজনেরা উদ্বেগ আর কান্নায় মূর্ছা গেলো। এই নির্দয় নগর ঢাকায় আমার এই একা ঘরে কেউ আসবেনা ভয়ে। মা কিংবা স্ত্রী স্বজনরাতো অনেক দূরের শহরে তখন কাঁদছে। লকডাউনেও তারা ছুটে আসতে চেয়েছে আমার কাছে। আমার স্ত্রীতো পুলিশের অনুমতিপত্র জোগাড় করেছে আসবে বলে।আমি বারণ করে বলেছি এলে সবাই একসাথে মৃত্যুর প্রহর গুনবো। 

জ্বর,গলাব্যাথা কাশি বাড়তেই থাকলো। নিজে নিজে এই ঘোরে; একা ঘরে রান্না করি। থালা বাসন ধুই, কাপড় কাঁচি৷ গরমপানির ভাপ নেই। আবার ফের সংজ্ঞাহীনের মতো পড়ে থাকি বিছানায়। চারদেয়াল বন্দি আমি একা একটা মানুষ। যেন ঘরের দেয়াল গুলো ঘন হয়ে কবরের মতো ঘিরে ফেলছে আমায়। নিঃসঙ্গ ঘরে,মনেহয় মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দিয়ে যাচ্ছি। ভাবি, দম বন্ধ হয়ে গেলে  স্বজনের ফোন বাজবে প্রতিদিনের মতো, কিন্তু ধরবেনা কেউ। ১০ম দিনে শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। সে কি তীব্র যন্ত্রনা। মনেহয় পৃথীবির সব গাছ বুঝি কেটে ফেলেছে মানুষেরা। অক্সিজেনের এতো স্বল্পতা? ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো করোনার নীল বিষে উপচে পড়ছে। দম বন্ধ হয়ে আসে একলা ঘরে। কাকে ডাকবো? প্রিয় মানুষগুলো তো অনেক দূরের শহরে তখন খবরের অপেক্ষায়। অফিস থেকে সাহস দেয়া হলো, চেয়ারম্যান মহোদয় ফোনে কুশলাদি জেনে সকল সহযোগিতার কথা জানালেন। প্রিয়তমা স্ত্রী, মমতাময়ী মা-বাবা ভাইবোন সবাই অহর্নিশ কুঁকড়ে যাচ্ছে শংকায়। আমি একা ঘরে দম বন্ধ করে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে। শরীর দখলে নেয়া অজস্র অনুজীবের সাথে আমি এক জীব তখন তুমুল লড়াইয়ে জ্বলছি নিভছি।  একসাঁঝে যেন দম বন্ধ হয়ে এলো। জানালাম বন্ধুদের, হাসপাতালে যাবার কথা বললো তারা।

উদ্বেগে ঘামতে থাকি। ভাবি বাঁচতে হবে,ফিরতে হবে চেনা কোলাহলে।উষ্ণ জলের ভাপ নিই। সময় গড়িয়ে রাত নামে।ধীরে ধীরে দমে কিছুটা স্বস্তি ফিরলে হাসপাতালে যাবার সিদ্ধান্ত পাল্টাই। পরের দিন শ্বাসকষ্টের সাথে শুরু হলো আমাশয়-ডায়রিয়া। রাইস আর ওরস্যালাইন চললো একটানা।

ভালোবাসার মানুষেরা অনেকে খাবার পাঠালো। সিড়ি ভেঙ্গে ঘোরের মধ্যে তা চারতলায় তুলে নিয়ে আসি।বাড়িওলা জানলে বাড়ি ছাড়তে বলবে তাই সেদিকেও ভয়।

চুপচাপ একাকি একটা ঘরে আমি আর করোনার যুদ্ধ চলে।ফোনে ডাক্তার আর যাবতীয় সব শুভাকাঙ্ক্ষীরা। রাত নেমে এলে মনে হয় মৃত্যুও মাথার সিঁথানে এসে বসে থাকে। কাউকে ডাকবার জো নেই, কারণ পানি এগিয়ে দেয়ারও কেউ যে নেই ঘরে। জীবিত আমি যেন মৃত্যুর সাথেই বসবাস করছি। সাহসে বুক বাঁধি। মহান রবের কাছে প্রার্থনায় অবনত হই৷ আদা লবঙ্গের ভাঁপে দম নিতে আরাম হয় বেশ। নেবুলাইজার দিয়ে গেলো বোন। টানা ১৪ দিন চারদেয়ালের ঘরে চলে যমে মানুষে টানাটানি। এরমধ্যে তো করোনায় মানুষের মৃত্যুর খবর পাচ্ছি প্রতিদিনই। রাত গভীর হলে চোখে ভেসে ওঠে সারি সারি লাশের ছবি। চোখের কোনে ঢলে পড়ে নোনা জলের রেখা। ক্লান্তিতে চোখ ভেঙ্গে আসে,তবুও ঘুম ধরেনা তাতে। ভাবি এই বুঝি যমদূত এলো। একা ঘরে মরে পড়ে থাকলেও কাউকে জানানোর কেউ নেই এখানে। শরীর দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। আবার ডিসেন্ট্রি, ডাইরিয়ার কারণে শক্তিশালী খাবারও খেতে পারছিনা। ডাক্তার ভাইয়ার পরামর্শে ওষুধ চলতে লাগলো। আরো দুজন চিকিৎসকের সাথেও কথা হয় ফোনে, পরামর্শ দেন তারাও। ১৬ দিনের মাথায় কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। জ্বর কমতে থাকে। তারপরের দিন কমে গলাব্যাথা। ডায়রিয়া কমেছে আরো অনেকদিন পর। আর কাশি শ্বাসকষ্ট কমেছে তারও পর। সাহসে বুকটা ফুলে উঠে। মনোবল দ্বিগুন হয়। ফোনে বেঁচে উঠবার সাহস যোগায় অফিস, বন্ধু, স্বজনরা। কৃতজ্ঞতার জালে আবদ্ধ করেন অনেকে। রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়ে অপরিশোধিত ঋণের জালে জড়িয়েছেন ভালোবাসার মানুষরা। 

মানুষের সহযোগীতা আর রবের ইচ্ছায় আস্তে আস্তে সুস্থতার পথে হাটতে শুরু করি। আমি দেখি এই ঘুপচি গলির শহরেও আমার আঁধার ঘরের জানলা দিয়ে রোদের আলো ঝলমল করছে। এই জ্বর,ডাইরিয়া আর শ্বাসকষ্টেও প্রতিদিন ডিটারজেন্টে কেঁচেছি গায়ের পোষাক, বিছানা,বালিশ কাঁথা পরিস্কার করেছি। ঘরে জীবানুনাশক ছিটিয়েছি ঘোরে বেঘোরে। সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছি বারবার।একটি আলাদা ঝুড়িতে জমিয়েছি টিস্যুসহ নিজের ব্যবহৃত জিনিষ। ধীরে ধীরে পাল্টায় পরিবেশ।সংজ্ঞাহীন খুঁড়িয়ে চলা আমি এবার হাঁটছি আমার ঘরের মেঝেতে। যোগ ব্যায়াম করি, দম নেই প্রাণ ভরে দৈনিক। ধীরে ধীরে সব অন্ধকারের পর্দা সরে যেতে থাকে। আলো আসছে যেন, অনেক আলো। নাকে গন্ধ পেতে শুরু করি। যেন বেঁচে থাকবার সুবাস পাই। আবার পৃথীবির পথ হাঁটবো ভেবে মৃত্যুকে পেছনে রেখে এগুতে থাকি। মানুষের কোলাহলে ফিরবো বলে শুধু সাহসটা দিয়ে যুুদ্ধ করে গেছি, সাহস হারানো যাবেনা কোন কিছুতেই।



মন্তব্য লিখুন :