নিউইয়র্কের বাংলা স্কুল

ওরা রফিক, বরকত, সালামকে জেনেছে

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে

শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।

কীসের গরব? কীসের আশা?

আর চলে না বাংলা ভাষা

কবে যেন হয়‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাঙালীর ভাষা নিয়ে উদাসীনতা, রসিকতা কিংবা তাচ্ছিল্যের প্রতি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন ভবানীপ্রসাদ মজুমদার তাঁর আলোচিত ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’ কবিতায় । দীর্ঘ কবিতাটির এখানে একটি অংশ উল্লেখ করা হলো মাত্র। ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতে জন্মনেয়া কিংবা বেড়ে ওঠা বাঙালী শিশু কিশোর এমনকি তরুনরাও যতো দ্রুত ইংরেজী আয়ত্ব করে তত দ্রুতই বাংলা ভুলে যায়। নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে গড়গড় করে ইংরেজী বলেন। অথচ অন্য ভাষাভাষীরা ঠিক উল্টো, তাঁরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি নয় নিজেদের ভাষায় কথা বলেন। বাঙালী কোন কোন অভিবাবক গর্বের সাথেও বলেন- “আমার সন্তান বাংলা বলতেই পারে না”। তাঁদের ক্ষেত্রে হয়তো কবিতাটি প্রযোজ্য। 

আশার কথা হচ্ছে- ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি বলেই নয়। শেকড়ের টানে প্রবাসী বাংলাদেশী অভিভাবকদের অনেকেই যত্নশীল পরিবারে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে। নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলা এবং সন্তানকে বাংলা শেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলা স্কুলেও। ব্যাক্তিগত উদ্যোগ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে আসছে এধরণের স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে। আগ্রহ বাড়ছে অভিভাবকদেরও। নিজেদের ভাষায় কথা বলা, ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের। তাঁরা জানছে রক্তস্নাত ভাষা সংগ্রামের কথা, ভাষা শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জাব্বারের কথা। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা বিজয়ও তাদের রঙতুলিতে ফুটে উঠে।

মাইনুরা মুনতাহা শেখ (৭) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের নাটিকায় অভিনয় করবে ভাষা শহীদ বরকতের মায়ের ভূমিকায়। নিইউয়র্কের ব্রুকলিনের বাঙালী অধ্যুষিত চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডে নোয়াখালী ভবনে বাংলাদেশ সোসাইটি পরিচালিত বাংলা স্কুলে বরকতের চিঠি হাতে মহড়া চলছে তাঁর। অন্য শিক্ষার্থীদের সহযোগীতার পাশাপাশি তাঁকেও দেখিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষিকা ফারজিন রাকিবা। এটুকুন বয়সে ভাষা শহীদদের জেনেছে এই ক্ষুদে শিক্ষার্থী।

ভরাট গলায় আবৃত্তি করে ফাসির কবির কাব্য। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিক্সথ গ্রেডের এই মেধাবী ছাত্র বাংলা স্কুলে সহপাঠীদের কাছে রীতিমতো দলনেতা। আবৃত্তি এবং দলীয় সংগীতের মহড়ায় সবাইকে সাথে নিয়েই করেন।

স্কুলের শিক্ষার্থীরা সমবেত কন্ঠে মহড়া দিচ্ছে অমর একুশের কালজয়ী “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের সাথে। ক্লাস চলাকালীন সময়ে আবার সবাই মিলে চর্চা করছে চিত্র অংকনের। চলছে আতোয়ার রহমানের “ঠিকানা” কবিতা এবং অতুল প্রসাদ সেনের ‘‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা”

ব্রুকলিনের এই বাংলা স্কুল পরিচালনা করে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মূল সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি। সাপ্তাহে একদিন রোববার ছুটির দিনে এই স্কুলে শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষা শিক্ষা (লিখতে এবং পড়তে) গ্রহণ করে। আছে চিত্রাংকন, আবৃত্তি এবং সংগীত শেখার সুযোগও। জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায়ও অংশ নেন এসব শিক্ষার্থী। কুইন্সে নিজস্ব কার্যালয়ে সোসাইটির আরো একটি বাংলা স্কুল রয়েছে। একইভাবে সেখানেও শিখছে শিশু শিক্ষার্থীরা। নিউইয়র্কে বাঙালী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে এধরণের স্কুল। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও নিজেদের আঙিকে এমন স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ব্রুকলিনের বাংলা স্কুলে শিশুদের নিয়ে এসে দীর্ঘ চারঘন্টা ক্লাস চলাকালীন সময়ে অভিভাবকরাও বসে থাকেন সন্তানকে উৎসাহ দিতে। গত রোববার সন্ধ্যায় সেখানেই কথা হয় মাইনুরা মুনতাহা শেখ’র বাবা শেখ মুনতাসির মাসুদের সঙ্গে। তিনি জানালেন মেয়েকে গত দুইমাস ধরে স্কুলে নিয়ে আসছেন তিনি এবং তাঁর স্ত্রী। তাঁরা বাসায় বাংলা কথা বলার চর্চা করেন সন্তানের সাথে। আর স্কুলে এসে বাংলাদেশের সাংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরী হয়েছে।

শিক্ষার্থী ইজদিয়ান বোরহান’র (৭)  মা তাসলিমা জাহান প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত আড়াই বছর ধরে ছেলেকে নিয়ে নিয়মিত বাংলা স্কুলে আসেন। সন্তান যেনো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করে এই মায়ের চাওয়া এটুকুই। চিত্রাংকন এবং আবৃত্তি চর্চায় মনোযোগী ছেলের সাথে এখন তিন বছর বয়সে মেয়েকেও নিয়ে আসেন তিনি।  

বিকাল তিনটা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ক্লাস শেষে আলাপচারিতায় এই দুই অভিভাবকের সাথে কন্ঠ মেলান উপস্থিতি অভিভাবকবৃন্দ। সবার একই কথা প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশুরা যেনো পূর্বপুরুষের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হয়ে বেড়ে উঠে। 

স্কুলের দেয়াল জুড়ে শিশু শিক্ষার্থীদের চিত্রকর্ম এবং নানা আয়োজন সাঁটানো রয়েছে। হঠাৎ করে যে কেউ এখানে প্রবেশ করলেই মনে হবে বাংলাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মহান বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বসন্তবরণ, পহেলা বৈশাখসহ বছরজুড়ে নানা আয়োজনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্কুল পরিচালনা সংগঠন তথা কমিউনিটি এক্টিভিস্টদের মিলন মেলা বসে। ক্ষুদে এসব শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ সোসাইটির আয়োজনে জাতীয় দিবসগুলোর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে।

শিক্ষক ফারজিন রাকিবা কাউকে অভিনয়ের মহড়া, কাউকে চিত্রকর্মে তুলির চুড়ান্ত টান দিতে, কখনো আবৃত্তি কখনো দলীয় সংগীত চর্চায় নিবিষ্টমনে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন ক্লাস চলাকালীন পুরো সময়। তাঁর ভাষায় প্রথম দিকে অভিবাবকদের আকৃষ্ট করার বিষয়টি নিয়ে বেশ বেগ পতে হয়েছিলো। সমারে স্কুল জুড়ে শিক্ষার্থীদের কলকাকলীতে ভরে উঠে। এখন শীতকাল হওয়ায় সবশিক্ষার্থী নিয়মিত নয়। সবচে বড় অর্জন হচ্ছে অভিভাবকদের আন্তরিকতা। যার ফলে স্কুল থেকে পাঠ নিয়ে এসব শিশু শিক্ষার্থীরা বাসায় চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছে। কমিউনিটিতে এরকম স্কুল যতো বেশী হবে ততো ‘বাংলা’ ভাষা-সংস্কৃতির শেকড় আরো বেশী গভীরে যাবে।

বিদ্যালয় পরিচালনাকারী সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ইউএসএ’র কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মাইনুল উদ্দিন মাহবুব জানালেন- শিশুদেরকে শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চারবছর পূর্বে স্কুল দুটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শিশু শিক্ষার্থীরা মুখরিত করে রাখে স্কুল। ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে যাতে আগামি প্রজন্ম সঠিকভাবে পরিচিত হতে পারে সেজন্যই এই উদ্যোগ।





মন্তব্য লিখুন :