প্রাইম হসপিটালের লকডাউন প্রত্যাহার এবং কোটি টাকার প্রশ্ন

এইমুহুর্তে নোয়াখালীতে সবচে আলোচিত বিষয় হচ্ছে হাসপাতালের শহর মাইজদীর প্রাচীনতম ক্লিনিক প্রাইম হসপিটালের লকডাউন প্রত্যাহারের বিষয়টি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পূর্বে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার তথ্য গোপন করায় দুই সাপ্তাহের জন্য হসপিটালটি লকডাউন করা হলেও শুধুমাত্র একটি ফ্লোর রেখে ৫ দিনের মাথায় পুরো হসপিটালের লকডাউন প্রত্যাহার করা হয়। যা এখন পুরো জেলার জন্য ঝুঁকি তৈরী করছে।  আর বিতর্কিত কাজটি স্বনপ্রণোদিত হয়ে করেছেন সিভিল সার্জন ডা. মমিনুর রহমান। প্রাইম হসপিটালের হয়ে সিভিল সার্জনকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নোয়াখালী শহর আওয়ামীলীগের এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী ঘনিষ্ঠদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নির্দেশনা পালন করা হয়েছে কিনা ? অগ্রগতি কি ? কোন কিছুই প্রকাশ না করে এমনকি করোনা সংক্রান্ত জেলা কমিটিকে অন্ধকারে রেখে সিভিল সার্জনের এমন হঠকারি সিদ্ধান্তের ফলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের মুখে নানা প্রশ্ন। এই প্রশ্নের দাম কোটি টাকারও বেশী। না, এই কোটি টাকা ঘুষ কিংবা অবৈধ লেনদনের বিষয় ভেবে কেউ ভুল করবেন না। এটি কোটি টাকা জনগণের প্রাণের চেয়েও দামী।

লকডাউন-

সোনাইমুড়ী উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ইতালি প্রবাসী মোরশেদ আলম (৪৫) করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে প্রাইম হসপিটালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু খামখেয়ালি করে বিষয়টি চেপে যায় প্রাইম হসপিটাল কতৃপক্ষ। এতে করে ঝুঁকিতে পড়ে হাসপাতালের চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্টরা। একইসাথে ঝুঁকি তৈরী হয় চিকিৎসাধীন রোগীদেরও। এবিষয়টি জানাজানি হলে প্রথমে সিভিল সার্জন চেপে যান। পরবর্তীতে সরকারের উচ্চ পর্যারয়ের চাপে ১৩ এপ্রিল প্রাইম হসপিটালকে লকডাউন ঘোষণা করেন সিভিল সার্জন। কিন্তু প্রাইম কর্তৃপক্ষ লকডাউনকে উপেক্ষা করে। পরদিন সিভিল সার্জন সেখানে গিয়ে তা দেখতে পান এবং লকডাউন করতে বাধ্য করেন। এসময় একজন সাংবাদিক ভিডিও করতে গেলে প্রাইম কৃর্তপক্ষ রূঢ় আচরণ করেন।

লকডাউনের নির্দেশে সিভিল সার্জন কি উল্লেখ করেছিলেন- মোরশেদ আলম গত ৫ এপ্রিল প্রাইম হসপিটালে ভর্তি হয় এবং ৫০৪ নং কক্ষে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এই সময়ে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অবহিত করা উচিৎ ছিলো কিন্তু  প্রাইম হসপিটাল কর্তৃপক্ষ তা করেনি। পরবর্তীকালে রোগী ঢাকা নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। পরে ঢাকায়  পরীক্ষায় ওই প্রবাসীর করোনা পজেটিভ আসে। 

তাই জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা এবং ভর্তিকৃত রোগীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাইম হসপিটালকে ১৩ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ১৪ দিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হইল। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি খালি করে জীবানুমুক্ত করতে হবে এবং সকল চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীচারীদের ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। বিনা ব্যার্থতায় এই আদেশ পালন করতে হবে।

লকডাউন প্রত্যাহার-

লকডাউনের আদেশের ৫দিনের মাথায়  ১৮ এপ্রিল কোন ধরণের অগ্রগতি প্রতিবেদন কিংবা করোনা সংক্রান্ত জেলা কমিটিকে অন্ধকারে রেখে লকডাউনের প্রত্যাহারের চিঠি ইস্যু করেন সিভিল সার্জন। এখানে শুধু ৫০৪ নং কক্ষসহ ৫মতলার লকডাউন আগামি ৭দিনের জন্য অব্যাহত থাকবে। বাকী পুরো হাসপাতাল খোলা থাকবে। 

প্রাইমের ব্যাবস্থাপনা পরিচালকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠির দ্বিতীয় প্যারায় তিনি লিখে- এমতাবস্থায় সিভিল সার্জন নোয়াখালী উক্ত ব্যাপারে পরিচালক রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রন ও গবেষণা ইনিস্টিটিউট এবং দৃষ্টি আকর্ষন ডাঃ মোঃ আলমগীর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মহাখালী ঢাকা এর সাথে পরামর্শন করেন। উক্ত পরামর্শের আলোকে আপনার প্রতিষ্ঠানের ৫০৪ নং রুমসহ ৫ম তলার লকডাউন আগামি ০৭ (সাত) দিনের জন্য অব্যাহ রাখিয়া হাসপাতালের অবশিষ্ট অংশের লকডাউন প্রত্যাহার করা হইল। আপনাকে বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকতর সতর্কতার সাথে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলো এবং শর্তাবলীগুলো যথাযথভাবে পালনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হইলো।

এবার বুঝেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের যেখানে বাধ্যতামূলক ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা পূর্বে বলা হয়েছিলো তাদেরকে বাজারে ছেড়ে দিয়ে কতোটা ঝুঁকির সৃষ্টি করেছেন সিভিল সার্জন। তারওপর হসপিটালটি খালী করে জীবানুমুক্ত হয়েছে কিনা তাও বলা  হয়নি চিঠিতে। প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন সিভিল সার্জনের কাছে প্রাইমের মালিক লকডাউন প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন কিংবা আইইডিসিআর’র এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সিভিল সার্জনের কাছে পরিস্থিতি জানতে চেয়েছেন এমন কোন তথ্য নাই চিঠিতে। পরামর্শের কাজটা তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছন, সেটাই প্রতীয়মান  হয়।

এদিকে লকডাউন প্রত্যাহারের খবরটি চাউর হয়ে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচে আলোচিত স্ট্যাটাস ছিলো “ডাল মে কুচ কালা হ্যায়”। কেউ আগ বাড়িয়ে সাংবাদিকদেরও দুষেছেন। কিন্তু মজার বিষয়টি হচ্ছে লকডাউন প্রত্যাহারের পুরো বিষয়টি তিনি করেছেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। সেটি সিভিল সার্জনের চিঠি পড়লে একটা ছোট বাচ্চাও বুঝবে। তিনি কি কারণে (?) করেছেন পাঠক আপনারা বুজে নেবেন। তবে; মাঠে রটনা রয়েছে প্রাইমের হয়ে পুরো বিষয়টি দেখভাল করেছে শহর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা। সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীও অসুস্থ হওয়ার পর নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন মাঝে মধ্যে। কিন্তু ওই নেতা চিকিৎসা নেন প্রাইমের ভিআইপি কেবিনে থেকে। জেনারেল হাসপাতালে পা মাড়াতে উনার কাতারের নেতাদের ঘেন্না লাগে।

প্রিয় পাঠক সিভিল সার্জন যে কারণেই হোক প্রাইমের লকডাউন নিয়ে যে মরণ খেলার ঝুঁকি নিলেন এতে তিনি পুরো জেলাবাসীকে ঝুঁকিতে ঠেলে দিলেন। এর বিচারের দায়িত্ব কে নেবে। কোন ব্যাক্তির ব্যবসায়ীক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তিনি সিভিল সার্জনের পদকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অথচ উনার পাশের ভববে জেলা প্রশাসকের অবস্থান, তাঁকে অন্ধকারে রেখে শুধু একটা চিঠি অনুলিপি হিসাবে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। এজন্য শুধু সিভিল সার্জনই নয়, যেসকল রাজনৈতিক নেতা বিষয়টি নিয়ে তদ্বির করেছেন এবং মুনাফালোভী প্রাইম কর্তৃপক্ষ সবাইকে জবাবদিহি করা উচিত। আমরা কোটি টাকা দামের এই প্রশ্নের উত্তর চাই।


মন্তব্য লিখুন :