অতনুর যুদ্ধ

পাশে থাকা ম্যাচ বক্সটা হাতে তুলে নিলো অতনু। ভিতরে একটিমাত্র কাঠি। অথচ পুড়ে ছাই হওয়ার অপেক্ষায় এখনো প্রহর গুনছে তিন তিনটি সিগারেট। গত দেড় ঘণ্টায় এই ক্রিসেন্ট লেকের পাড়ে বসেই সাতটি সিগারেট শেষ করেছে অতনু। অন্য যেকোনো সময় লেকের পাড়ে বসে দিনের সমাপ্তি দেখতে তার ভালোই লাগে। কিন্তু আজ তার মন খুবই বিক্ষিপ্ত। কিছুতেই নিজের মনকে শান্ত করতে পারছে না। তাকে দেখাচ্ছেও বিধ্বস্ত। লাগাটাও স্বাভাবিক। কারণ গতকাল রাতেই তার সাথে ঘটে গেছে এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা। 

অফিস থেকে ফেরার পথে দূর থেকে বিধ্বস্থ চেহারায় অতনুর সিগারেট খাওয়া দেখে পথ আটকে যায় রাজিতের। যে ছেলেকে কখনো সে সিগারেট খেতে দেখেনি, অথচ একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে! এগিয়ে গিয়ে অতনুর কাঁধে হাত রাখে রাজিত। ঘাড় ফিরিয়ে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে দাঁড়ায় অতনু। কোন সমস্যা হয়েছে? আমাকে বলতে পারো- জানতে চায় রাজিত। না, তেমন কোন সমস্যা নেই- অতনুর এমন উত্তরে রাজিত শুধু বলে-প্রয়োজন মনে করলে শেয়ার করতে পার। কোন সাড়া না পেয়ে, অতনুকে শান্তনা দিয়ে পা বাড়ায় রাজিত। একই ডিপার্টমেন্টে অতনুর দুই বছরের সিনিয়র রাজিত। ছোট ভাইয়ের মতোই তাকে স্নেহ করেন। মাস্টার্স শেষ করেই রাজিত চাকরিতে জয়েন করেছে মাত্র।

রাজিতের চলে যাওযা দেখছে আর নিজেকে অপরাধী লাগছে মানসিকভাবে বিধ্বস্থ অতনুর। ঘুরেফিরে গতকালের ঘটনাটই সামনে ভেসে উঠছে। গতকাল অতনুর জন্মদিন ছিল। বন্ধুদের নিয়ে রাতে কোথাও খেতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে। রাত ৯টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে বসে বন্ধু জয় আর ইমুর জন্য অপেক্ষা করছিল অতনু। সঙ্গে ছিল সহপাঠী অরুনিমা। ইমু আর জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় রাত ১০টা বেজে যায়। যানজটের কারণে তাদের আসতে দেরি হচ্ছে, মুঠোফোনে বারবার জানাচ্ছিলো তারা। অতনু আর অরুনিমা চিন্তা করে এবার উঠবে। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে এসে হাজির হয়। কোনো কথা বার্তা ছাড়াই শুরু করে অশালীন ভাষায় গালাগালি। অভিযোগ তোলে অনৈতিক কর্মকা-ের। অতনু আর অরুনিমা ওই পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগের প্রতিবাদ করে। অনুরোধ করে ভালোভাবে কথা বলতে। এতে আইনের ওই কর্মকর্তা আরো ক্ষেপে যায়। এমনকি হাত তোলে অতনুর গায়ে। ইতোমধ্যে আশাপাশে মানুষ ঝড়ো হয়ে যায়, এসে পৌঁছায় ইমু আর জয়ও। খবর পেয়ে আসে ছুটে আসেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা অতনু আর অরুনিমাকে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টা মিটমাট করে নিতে বলে। কিন্তু অতনু আর অরুনিমা তাদের সিদ্ধান্তে অটল। তাদের কথা একটাই, তারা কোনো অন্যায় করেনি। শুধু বসে ছিল। তারপরও যদি তারা কোনো অন্যায় করে থাকে তাহলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতো। একটি স্বাধীন দেশে চাইলেই কারো গায়ে হাত তোলা যায় না। তাও আবার আইনের রক্ষক হয়ে। ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে অবশ্যই তার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। কিন্তু ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাতে রাজি হয়না। এক পর্যায়ে তাদের সবাইকে থানায় যেতে হয়। পথিমধ্যে পুলিশ ভ্যানের ভেতর আরো একবার বিষয়টি সমঝোতা করে নিতে বলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছিল তা অতনু আর অরুনিমা ঠিকই বুঝতে পারে। কিন্তু ওইসব অন্যায় সমঝোতায় না গিয়ে নিজেদের সদ্ধান্তে অটল থাকে অতনু-অরুনিমা। তাদের আশা ছিল থানায় গেলে তারা হয়তো ন্যায় বিচার পাবে। কিন্তু তাদের আশাভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। থানায় গিয়েই তারা বুঝতে পারে তারা কোনো সহায়তা পাবে না। থানার বড় কর্মকর্তারা অন্যায়ের বিষয়টি বুঝতে পেরেও শুধু নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবার ভয়ে ওই অন্যায়কারী পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষ নিচ্ছেন। এমনকি ভয়ও দেখাচ্ছেন প্রয়োজনে অতনু আর অরুনিমাকে অন্য কোনো মামলায় ফাঁসিয়ে দিবেন। এদিকে রাতও গভীর হয়ে আসছে। তাই অন্যায়ের কাছে মাথা পরাজিত হয়ে তাদের ফিরতে হয় মুছলেকা দিয়ে।

থানা থেকে বের হয়ে অরুনিমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে এসেছে ইমু আর জয়। আর পরাজিত সৈনিকের বেশে মাঝরাতে বাড়ি ফেরে অতনু। তারপর থেকেই অশান্ত হয়ে উঠেছে অতনুর মন। বুকের মধ্যে যেনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সারারাত ঘুমাতে পর্যন্ত পারে নাই সে। তাই ভোর হতেই বেরিয়ে পড়েছে অজানার উদ্দেশ্যে। সারাদিন ইট কাঠের এই জাদুর শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে উ™£ান্তের মতো। নিজের মনকে শান্ত করতে পড়ন্ত বিকেলে এসে বসেছে এই ক্রিসেন্ট লেকের পাশে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। অথচ এখানে বসেই সে দিনের সমাপ্তি দেখতে অভ্যস্ত। কাল রাত থেকে শুধু একটি কথাই তার মনে এসেছে, এ কেমন স্বাধীনতা ? এ কেমন বেঁচে থাকা? এই দেশ তার না, এই দেশে আর সে থাকবে না।

এই প্রথমবার যে অতনুর এমন কথা মনে হয়েছে তা নয়। বছর পাঁচেক আগে যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল, হরতাল-অবরোধের নামে রাস্তায় মানুষ পুড়ে মরছিল, এক নিমিষে শেষ হয়ে যাচ্ছিল কত পরিবারের স্বপ্ন। তখনও এমনটা মনে হয়েছিল অতনুর। এই কথাটা কাছের এক বড় ভাইকে বলেছিলও সে। কিন্তু প্রতিউত্তরে ওই বড় ভাই তাকে সঙ্গে সঙ্গে একটি চড় মেরেছিল। আর বলেছিল, এমন কথা যেনো আর কখনো না বলে। অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক ত্যাগে এই আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই উৎসর্গ করে দিয়েছিল নিজেদের। তাদের এমন আত্মত্যাগ কেন? পরবর্তী প্রজন্ম যাতে ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়, মন খুলে কথা বলতে পারে, মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য। মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিবে রাষ্ট্র, তাইতো নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। নিজের দেশকে নিয়ে এমন কথা বলা উচিত নয়, বরং গর্ব করা উচিত।

সেই দিনের পর থেকে অতনু মাতৃভূমির প্রতি এক অদ্ভূত টান অনুভব করতো। জাতীয় সঙ্গীতের শব্দ কানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দাঁড়িয়ে যেতো। মনে মনে গাইতো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। যতক্ষণ না পুরো গান শেষ হতো ততক্ষণ আর কোনো কাজ করতো না। কোথাও বৃদ্ধ কাউকে দেখতে পেলেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাইতো। গল্প শুনতে শুনতে নিজেও চলে যাতো সেই যুদ্ধের সময়কালে। কিন্তু গতকালের ঘটনার পর অতনুর মনে আবার দেশের প্রতি বিতৃষ্ণা দেখা দিয়েছে। থাকবে না আর সে এই দেশে। চলে যাবে অন্য কোথাও। নইলে আবার একটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হোক এমনটাই চায় সে। তবে এবারের যুদ্ধ অত্যাচারী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে নয়। 

এবারের যুদ্ধ সেসব হায়নার বিরুদ্ধে, যারা এখনো বয়ে বেড়ায় পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মা। মেধা-মননে লালন করে পাকিতন্ত্র। আর এই যুদ্ধই ডাক দিচ্ছে অতনুসহ অজস্র তরুণকে। বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণের এই যুদ্ধে হেরে যাওয়া চলবে না, এই যুদ্ধে হেরে গেলে হেরে যাবে বাংলাদেশ। 

অতনু’র  শপথ, সে হেরে যাবে না। লড়বে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত। তবু বাংলাদেশকে হারতে দিবে না।

-সুব্রত চন্দ
গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

মন্তব্য লিখুন :