নোয়াখালীতে দুই ইউপি চেয়ারম্যানের অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে কাঠ

মরে যাচ্ছে গাছপালা

পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে জরিমানার পরও ইটপোড়ানো চলছে নোয়াখালী সদর উপজেলার আন্ডারচর ইউনিয়নের অবৈধ এফবিএম ব্রিক ফিল্ডে। জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। একইভাবে কালাদরাফ ইউনিয়নের রামহরিতালুক এলাকায় চলছে আরেকটি অবৈধ ইটভাটা। ভাটার কালো ধোঁয়ায় পাশ্ববর্তী বাড়ির গাছপালা মরে যাচ্ছে। দুইটি ইটভাটার মালিকই স্থানীয় দুইটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। ফলে এ নিয়ে প্রতিবাদের সাহস নাই কারোর। 

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আন্ডারচর ইউনিয়নের পূর্ব মাইজচরা গ্রামে গড়ে ওঠেছে এফবিএম ব্রিক্স নামের একটি ইটভাটা। ভাটায় ব্যবহার হয়েছে ড্রাম সিমনি। জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কয়লার পাশাপাশি কাঠ। এতে ভাটার আশেপাশের বাসিন্দারা ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন। 

ভাটায় কর্মরত শ্রমিকেরা জানান, তিন বছর ধরে ইটভাটাটি চলছে। ভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লার পাশাপাশি কাঠ ব্যবহার করেন তাঁরা। পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম ওই ইটভাটার মালিক। কয়েকদিন আগে একটি মামলায় আদালতে আত্মসমার্পনের পর বর্তমানে তিনি জেল হাজতে রয়েছেন। টিনের চিমনি ব্যবহার করেই গত তিন বছর ধরে ভাটাটি চলছে বলে জানান তাঁরা।

ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চলতি মাসের প্রথম দিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন ম্যাজিষ্ট্রেট ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নিয়ে এসে ভাটাটিকে জরিমানা করেছেন এবং ইটপোড়ানো বন্ধ রাখতে বলেছেন। কিন্তু কর্মকর্তরা এলাকা ত্যাগ করার পর যথারীতি ভাটাটি চালু রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা হয় ভাটার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান নুরুল আলমের ভাগ্নে মাহমুদুর রহমান ওরফে রাজুর সঙ্গে। তিনি বলেন, পরিবেশ ইটভাটা স্থাপনের জন্য তাঁর মামা নুরুল আলম পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কয়েকদিন আগে ভাটা পরিদর্শন করে গেছেন। এখনও লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। তাই হাওয়াই ইটভাটা করার জন্য এখন ইটপোড়ানো হচ্ছে।

এই ইটভাটার তিন-চার কিলোমিটার দূরে কালাদরাফ ইউনিয়নের রামহরিতালুক গ্রামে ডিবিএম ব্রিক ফিল্ডের অবস্থান। ভাটাটির পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে রয়েছে অনেকগুলো বসতবাড়ি। এরমধ্যে ভাটার পূর্ব-উত্তর দিকের বাড়ির গাছপালাগুলো ভাটার কালো ধোঁয়ায় মরে যাচ্ছে। ফলজ গাছে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে টিনের চিমনির এই ভাটাটি চলছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এই ভাটার মালিকও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। তাঁর নাম মিজানুর রহমান। একাধিক অংশিদার রয়েছেন তাঁর সঙ্গে। এই ইটভাটায় পাওয়া যায় শত শত মন জ্বালানি কাঠ। পুরো ভাটা ঘুরে কোথায়ও কয়লা দেখা যায়নি। কর্মরত একাধিক শ্রমি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভাটাটিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠই পোড়ানো হয়। মাঝে-মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন আসেন বলেও উল্লেখ করেন তাঁরা।

অবৈধ এই ইটভাটার কারণে আশেপাশের বাসিন্দাদের ভোগান্তি চরমে। ভাটার কালো ধোঁয়ায় কমে গেছে এলাকার অন্যতম কৃষিপন্য হোগলাপাতাসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও। মাঠে হোগলা পাতা কাটছিলেন এক কৃষক। তিনি বলেন, আগে ওই এলাকায় হোগলা পাতার চাষ বেশ ভালো হত। গত দশ বছর আগে ইটভাটাটি হওয়ার পর থেকে হোগলা পাতার উৎপাদন কমে গেছে।

ভাটা-সংলগ্ন বাড়ির গৃহীনি তাছলিমা আক্তার বলেন, ইটভাটাটি হওয়ার পর থেকে নারকেল, সুপারি গাছের ফুল থেকে ফল ধরার কয়েকদিন পর ফল ঝরে পড়ে যায়। অন্যান্য ফলগাছেরও একই অবস্থা। বাড়ির কাছে ইটভাটা হওয়ার পর থেকে সন্তানদের ঠিকমত গাছের ফল খাওয়াতে পারেন না। ভাটার কালো ধোঁয়ায় গাছ-পালাগুলো মরে যাচ্ছে। কখনও কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি তাঁরা।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ভাটার মালিক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি। ভাটার ব্যবস্থাপক মোশারফ হোসেন ওরফে হেলাল মুঠোফোনে স্বীকার করেন, ইটভাটাটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নাই। তাঁরা আবেদন করেছেন। তিনি জানতে চান- নিউজ করা হবে কি না? নিউজ না না হলে প্রয়োজনে চেয়ারম্যান সাহেব দেখা করবেন।

অবৈধ ইটভাটা দুইটির বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ভাটা দুইটিতে কিছুদিন আগে তাঁরা অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছেন। এখন ভাটা চলছে কি না তাঁর জানা নেই। ভাটার মালিকদের ইট পোড়ানো বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুল ইসলাম সরদার বলেন, অবৈধ ওই ইটভাটার বিষয়ে তিনি অবগত নন। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের বিষয়টিও তিনি জানেন না। তিনি এ বিষয়ে সহকারী কমিশনারকে দিয়ে খোঁজ নিয়ে আইনগত পদক্ষেপ নিবেন।

মন্তব্য লিখুন :