ক্ষুধায় লজ্জা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা যায় না

প্রতিবেশীর খবর রাখুন, সহযোগিতার হাত বাড়ান

করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ হিসাবে নোয়াখালীতে জনগণকে যার যার ঘরে অবস্থান করার কথা থাকলেও বল প্রয়োগ করেও মানুষজনকে ঘরে রাখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত  জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোয়াখালীকে লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। যদিও গত দুই সাপ্তাহ ধরে দেশে সাধারণ ছুটি চলার ফলে সবচে বেকায়দায় পড়ে দিনে এনে দিকে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষ এবং দরিদ্র জনসাধারণ। একইসথে মুখফুটে বলতে না পারা মধ্যবিত্ত শ্রেনীও পড়ে বেকায়দায়। 

এনিয়ে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার তরুন সাংবাদিক আব্দুল বারি বাবলুর ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে ফুটে উঠে  এরকম এক অসহায় পরিবারের বর্ণনা। আপনার পাশে এরকম অসংখ্য পরিবার আছে। তিন ঘন্টায় বাবলুর দেওয়া পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ২৩৭জন শেয়ার করে ১৬ জন এবং কমেন্ট করে ১০৫ জন। স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন পর্যায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসন এবং জেলা পরিষদের পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের চেষ্টা করা উচিৎ তাদের পাশে দাঁড়ানোর। 

যার যার সাধ্য অনুযায়ী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় এখন। আমার আপানার পাশের বাড়ির পরিবারটি না খেয়ে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এর দায় এড়াতে পারবেন ? ইতোমধ্যে অভাবের তাড়ানায় শ্রমজীবী মানুষের আত্মহননের খবরও গণমাধ্যমে বেরিয়েছে। এখন কাউকে অভিযুক্ত করার সময় নয়, সময় একসাথে পথ চলার। কারণ এ পরিবারের মতো অনেক পরিবারই লজ্জায় ক্ষুধার কথা বলতে পারবে না। পারলে হয়তো খাদ্য সহায়তা জুটে যাবে, তাই প্রতিবেশীর খবর রাখার চেষ্টা করতে হবে সবার আগে।

পোস্ট নিয়ে কথা হয় সাংবাদিক বাবলুর সাথে। এধরণের আরো ঘটনার মর্মস্পর্শী বর্ণনা শোনা যায় তাঁর কন্ঠে। সবচে বড় কথা হচ্ছে গত কয়েক দিন ধরে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও এমনিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়েও মানুষকে ঘরে ফেরানো যায়নি  সম্পূর্ণভাবে।  মানুষকে ঘরে ফেরাতেই বেশী সময় ব্যায় হয়ে গেছে। এতেকরে কিছু অসহায় পরিবারকে হয়তো খাবার সরবরাহ করা গেছে কিন্তু খাবার সরবরাহে পূর্ণ মনযোগ দিতে পারেনি প্রশাসন।

নিচে আব্দুল বারী বাবলুর পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

শুক্রবার সন্ধ্যা ৬:১০ মিনিট হঠাৎ একটা ফোন আসলো। একটি মেয়ে ওপার থেকে বলছে ভাইয়া আমি আপনাকে একটা কথা বলতাম,আমি বললাম বলেন: একথা বলতেই কান্না জড়িত কন্ঠে বললো আপনি কি একটু আমার বাড়িতে আসতে পারবেন?

মনে নানান প্রশ্ন জাগালো তবুও সব উপেক্ষা করে রাতেই ছুটে গেলাম তার বাড়িতে। বাড়িতে গিয়েই দেখলাম একজন বয়স্ক মহিলা দাড়িয়ে আছে আর একটি মেয়ে ফেলফেল চোখে তাকিয়ে আছে। যখন বললাম উমুক (নাম প্রকাশ করা যাবে না) কে? তখন মেয়েটির মা দাড়িয়ে কাঁদছে। ভাবলাম হয়ত কোন ঝগড়া হয়েছে!  

কিন্ত আমার ধারনা ভুল। তাদের চোখের পানি বলছে অন্যকথা। মেয়েটি বলল ভাইয়া কাউকে লজ্জায় বলতে পারছি না। অনেক কষ্ট চেপে রেখে ভাবলাম আপনাকে বলি। বললাম বলেন, বলতে বার বার ইতস্ত করছে!  

ক্ষুধার রাজ্যে লজ্জার দরজা বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না, হাল ছেড়ে দিলেন বললেন আমি আমার বিধবা মাকে নিয়ে কষ্টে আছি। ঘরের খাবার শেষ আজ কয়দিন খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। কারো কাছে লজ্জায় বলতে পারছি না। কারণ বাবা একসময় সরকারি চাকুরী করতো। মা হার্টঅ্যাটাক করার পর এখন আর কিছুই নেই। 

বাবার যৎসামান্য বাড়ির প্রায় বিক্রি করে দিয়েছে আমার সুখের জন্য।কিন্তু আমার সুখ সইল না। বিয়ের ৩ বছর পার হলেও স্বামী খবর নেয়না। অনেক কষ্টে স্নাতক পাশ করে, টাকার জন্য কোথাও চাকুরীর জন্য আবেদন করতে যে যৎসামান্য খরচ লাগে তাও জোগাড় করতে পারছি না।

কথা গুলো শুনতে শুনতে জানতে চাইলাম আজ কি রান্না করেছেন? কি তরকারি করেছেন? বললো খেয়েছি তরকারিও আছে!  ঘরে গিয়ে দেখলাম পাতিলের তলানিতে সামান্য ভাত আর পাতিলে ঢ়েড়স ভাজা একটু আছে। 

জানতে চাইলে তার মা কেঁদে উঠে বলে, বাবা ২৫০ গ্রাম চাউল ছিল তা রান্না করেছি ও ২০০ গ্রাম ঢ়েড়স ভাজি করেছি। মা মেয়ে দুজনে দুপুরে খেয়েছি। আমি অসুস্থ তাই মেয়ে রাতে খাবে না, আমার জন্য। 

তাদের বসত ঘরটি নড়বড়ে হালকা বাতাস হলেই তছনছ হয়ে যেতে পারে। আবার বৃষ্টি হলেই ঘরেই পানি পড়ে। দরজা ভাঙা, জানালা গুলো ঝরে পড়ছে। শোয়ার চৌকির অবস্থা যায় যায়। তাদের জীবন এক কষ্টের  হৃদয় ছুয়ে যাওয়া বাস্তবতার অপ্রকাশিত গল্প।

এত যাতনার মাঝেও মেয়েটি একটি চাকুরী প্রত্যাশা করছে। বিধবা মায়ের স্বামীর অবহেলার স্বীকার শিক্ষিতা মেয়েটির আবেদন, সে তার বিধবা মাকে নিয়ে শুধু বেঁচে থাকতে চাই। নিশ্চয়ই কেউ এগিয়ে আসবেন।

আমি আমার সহকর্মী জহির উদ্দিন তুহিন কে নিয়ে রাতে তার ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছি। ধন্যবাদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ এস এম ইবনুল হাসান ইভেন মহোদয় কে। তিনি বলা মাত্রই তাদের জন্য কিছু খাবার আমার হাতে তুলে দিলেন।

যারা লেখাটি পড়লেন তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ পরিবারের খাবার দায়িত্ব আমরা নিলাম কিন্তু  খবর নিন আপনার পাশে এরকম অনেক পরিবার আছে যে পরিবারটি হাত পেতে চাইতে পারছে না। তাকে সহযোগিতা করুন তার সকল পরিচয় গোপন রেখে।

উল্লেখ্য- এ পরিবারটির পাশের বাড়ি একজন কোটিপতির। চরআমান উল্যাহ ইউনিয়ন। 

বিশেষ অনুরোধ: (কেউ এ পরিবারের পরিচয় জানতে চাইবেনা না)।


মন্তব্য লিখুন :