একজন অসহায় ডিসি এবং চৌমুহনী খুলে দিতে ব্যাবসায়ীদের চাপ

নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনী। এখান থেকে পুরো জেলায় যেমন ব্যাবসাপাতি নিয়ন্ত্রিন হয়, পন্য সামগ্রী যায় জেলার সর্বত্র। সেজন্য চৌমুহনীর গুরুত্ব যেমন সর্বজনবিদিত তেমনি এখান থেকে একই কায়দায় ছড়িয়েছে করোনা ভাইরাসও। কারণ এখানে পন্য কিনতে আসা মানুষগুলো যেখানে গেছে সেখানেই ছড়িয়েছে ভাইরাস। এখানকার ব্যবসায়ী নেতা, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও আক্রান্ত হয়েছেন। তারপরও উপজেলা প্রশাসনের ওপর যে কায়দায় তাঁরা চাপ প্রয়োগ করছেন তা রীতিমতো বিস্ময়ের। এখানকার ক্ষমতাসীন দলের বিভাজনে সুযোগ সন্ধানী ব্যাবসায়ীরাও নিজেদের দুইভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। এছাড়া ব্যাবসায়ীদের বড় অংশ সরকারের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ঘরাণার হওয়ায় তাঁরা ইতিবাচক কিছু বললেও সরকারি দলের লোকজন সেটিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়। এঅবস্থায় অসহায় হয়ে চৌমুহনীর লকডাউন তুলে দিচ্ছে প্রশাসন।

এনিয়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের ফেসবুকে লিখেছেন। সবচেয়ে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে জেলার প্রধান কর্মকর্তা জেলা প্রশাসস তন্ময় দাসের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। তিনি মঙ্গলবার নিজের আইডিতে লিখেছেন ‘বিবেচনা করুনঃ আজ ৮১ জন সহ আক্রান্ত ৭৬৯ জন। মোট মৃত্যু ১৭জন। এর পরেও রেড জোনখ্যাত চৌমুহনী বাজারকে খুলে দিতে প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছেন’। ৩৬ ঘন্টায় এই পোস্টে কমেন্ট করেছেন ৭৪৮জন আর শেয়ার হয়েছে ৯২০ বার। এবার বুঝেন মানুষ কতোটুকু উদ্বিগ্ন ? অথচ রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু ব্যবসায়ী এটি বুঝতে চান না। যারা চৌমুহনীর আগামি সময়ের নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে গুটি চালছেন তারা কি (?) ভালো করছেন ?

এনিয়ে ক্ষুব্ধ গণমাধ্যমকর্মী চ্যানেল টুয়ান্টি ফোরের নোয়াখালী প্রতিনিধি সুমন ভৌমিকের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

বেগমগঞ্জে কাদের বসবাস! সাধুরা সাবধান...

(শুরুতেই বলে দেই, মঝা শেষে। তবে দু-চারটা গালমন্দ করেছি, সেটা নিতান্তই কষ্ট থেকে। আরেকটি কথা আমি সাধারণত ট্যাগ দেই না। এ লেখাটা দিলাম ক্ষমা করবেন)

গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন ‘বিবেচনা করুনঃ আজ ৮১ জন সহ আক্রান্ত ৭৬৯ জন। মোট মৃত্যু ১৭জন।

এর পরেও রেড জোন খ্যাত চৌমুহনী বাজারকে খুলে দিতে প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছেন’। 

এখন কথা হলো একজন জেলা প্রশাসক এভাবে অসহায়ের মতো কখন এ পোস্ট করেন। জেলায় আজ এ পোস্ট দেয়া পর্যন্ত আক্রান্ত আমার জানামতে মোট ৮২৮জন, এর মধ্যে শুধু বেগমগঞ্জেই প্রায় ৪০০জন। জেলায় মোট মৃত্যু ২২, এর মধ্যে বেগমগঞ্জে মৃত্যু ১৪। এর বাহিরে উপসর্গ নিয়ে বেগমগঞ্জে এ পর্যন্ত মারা গেছে আরো অন্তত ১০জন। যাদের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সুতরাং জেলার করোনা রেডজোন হচ্ছে চৌমুহনী তথা বেগমগঞ্জ উপজেলা। হ্যা, মানি পুরো দেশের লগডাউন তুলে দিয়ে সব কিছু স্বভাবিক করে দিয়েছে সরকার। আবার সে সরকারই বলছে জেলা ভেদে ভাগ করে হয়তো পুনরায় আবার লগডাউন করতে পারে। তাছাড়া স্ব স্ব জেলা প্রশাসন যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, জেলা বা কোনো উপজেলা লগডাউন করা দরকার,- তাহলে করতে পারেন। এমনকি প্রয়োজনে ১৪৪-ও জারি করতে পারেন। সুতরাং জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন নিশ্চই বেগমগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনের কথা চিন্তা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটাকে সাধুবাদ না জানিয়ে উল্টো লগডাউন তুলে দিতে চাপ প্রয়োগ করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। 

ব্যবসায়ী নেতারা করছেন নাকি এর সঙ্গে যুক্ত আছেন মোটা মাথার লোকজন? তা অবশ্য আমরা ভালোই জানি। 

আমি একটি সংবাদ ভালোই জানি। এ পর্যন্ত বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে করোনায় আক্রান্তদের অনেকের বাড়িতে ওষধ ও ব্যবস্থাপত্র পর্যন্ত পাঠিয়েছেন। সরকারিভাবে করোনায় আক্রান্তদের জন্য তেমন কোনো বাজেট নেই। কিন্তু তারপরও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাজেট থেকেই মূলত তারা এসব ওষধ বাড়ি বাড়ি দিচ্ছেন। তাহলে স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনের হোগায় কি বিষ আছে- মরলে আপনি মরবেন, তাদের এত দায় লাগলো কেন ওষধ বাড়ি পাঠানোর। তবুও তারা করছে। একদিকে করোনা শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করছেন, আবার ওষধ পাঠাচ্ছেন, ফোন করে যতটুকু সম্ভব খোঁজ খবর নিচ্ছে আক্রান্তদের। জানি তারপরও সুযোগ পেলে আপনারা কেন?, সেই আমি সংবাদকর্মীই ওই ডাক্তার বা স্বাস্থ্য বিভাগের পাচায় এক চামুচ দেব।

এখন কথা হলো এই বেগমগঞ্জে শত শত মাঝারি ব্যবসায়ী রয়েছে। যারা প্রত্যেকে লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। আবার বহু রাজনীতিবিদ রয়েছেন যারা একাধারে চাঁদাবাজ, ঠিকাদার, উন্নয়ন কাজের পিসিভোগী কোটি কোটি টাকার মালিক। তারপর রয়েছে বিশিষ্ট শিল্পপতি। এ শিল্পপতিও রয়েছে অন্তত কয়েক ডজন। তাহলে তারা এ করোনা সংকট কালে মানুষের জন্য কি করেছেন? কৈ আপনারাতো করোনা রোগীদের কোনো খোঁজও ঠিক মতো নিচ্ছেন না। শুধু মিডিয়া কাভারেজের জন্য চাল, ডাল আর তেলের বোতলসহ বস্তা হাতে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই আপনারা যদি মানুষের জন্য এতই দরদি হন- তাহলে দেন না বেগমগেঞ্জে একটা ১০০ শয্যার অস্থায়ী কোভিড-১৯ আইসোলেশন সেন্টার বানিয়ে। পাশাপাশি অস্থায়ীভাবে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেন। সবাই মিলে কয়েক লাখ টাকা অনুদান দেন ওষধ-পথ্যসহ আনুসাঙ্গিক ক্রয় করার জন্য। একই সঙ্গে যাতে করোনা রোগিরা ভালো সেবা পান, সে জন্য স্বাস্থ্য ও নির্বাহী প্রশাসনকে চাপ দেন। তাহলে বুঝবো আপনারা রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, জনগণের বন্ধু, আপনাদের যা আছে তা মানুষের কল্যাণে; শুধু মিডিয়া কাভারের জন্য আপনারা করেন না। তাহলেই ভাববো আমরা যারা আপনাদের ভূয়া ভাবি তা মিথ্যা। 

আমি জানি এ লেখা যারা পড়বেন তাদের মধ্যে যারা দুষ্ঠু প্রকৃতির তারা আমাকে বলবেন ‘কি বদজাত, কি বদজাত, কি বদজাত রে’ কতবড় হারামিরে। বলেন তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। মাঝে মধ্যে একটু আধটু ইয়ে না করলে আপনারেদ চুলকায় না। আরে আপনাদের কারো কারো কাছে এ মৃত্যু ও আক্রান্ত শুধুই সংখ্যা। কিন্তু যাদের যাচ্ছে তারা বলতে পারবে এক একটা ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে একমাত্র বাঁচার অবলম্বন।

যখনই বেগমগঞ্জে করোনা আক্রান্তের বাড়তে শুরু করল তখনই আমরা গণমাধ্যমকর্মীরাই প্রশাসনকে চাপ দিয়েছিলাম, নিউজ কিংবা লাইভে দাঁড়িয়ে বার বার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি উপজেলাকে দ্রুত লগডাউন করতে এবং তা কঠোরভাবে বাধ্য করতে। কারণ এটা যদি ছড়ায় তাহলে পুরো জেলা শেষ। আমাদের কারণে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, প্রশাসন ঠিকই লগডাউন করেছে, কিন্তু অনেক পর। তাও ছিল ঢিলেঢালা ফলে আজকের এ দুর্বব্যস্থা হলো। আজ প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। যাইহোক তবুও নির্বাহী, পুলিশ ও স্বাস্থ্য প্রশাসন যথেস্ট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশের সদস্য, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা। কাদের জন্য? তারা এসব করছেন? শুধুই তারা তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য করছেন? নাকি মানবিক দিক ও মানুষের কথা চিন্তা করে এসব করছেন? শুধু চাকরি নয়, মানবিক দিক বিবেচনা করেই তারা এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে আসছে। 

যেসব হারামিরা এখনও প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছেন তারাও বাঁচবেন না বলে দিলাম। এখনও সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনা মোকাবেলায় কাজ করুন। না হয় আরো ভয়াবহ কিছু আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আশা করি বিষয়টি ভাববেন। খামখা গুটি কিছু ব্যবসায়ীর কথা চিন্তা করে আপনারা জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দরা সবাইকে ধংসের মুখে ঠেলে দিতে পারেন না। 

সুমন ভৌমিক, ০৩.০৬.২০২০, নোয়াখালী।


চৌমুহনীর লকডাউন প্রত্যাহারে প্রশাসনকে চাপ দেওয়া নিয়ে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদ   'রেড জোন' চৌমুহনীতে লকডাউন তুলে নিতে ব্যবসায়ীদের চাপ



মন্তব্য লিখুন :