সামাজিক দুরত্বে লঙ্গরখানায় ভাসমান মানুষের তৃপ্তির ভোজ

জীবানুমুক্ত পরিবেশে খাবার পরিবেশন

ক্র্যাচের ওপর বসে তৃপ্তিসহকারে খাচ্ছেন একজন, তাঁর পাশেই সামাজিক দুরত্বে দীর্ঘ সারিতে নারী, পুরুষ নির্বিশেষে নানা বয়সের মানুষ খাবার খাচ্ছেন। খাবারের জায়গাটুকুও জীবানুনাশক স্প্রে করে ঝুঁকিমুক্ত করতে চেষ্টা করছেন স্বেচ্ছাসেবী। খাবার সাজানো, স্বেচ্ছাসেবীদের কার্যক্রম, উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ভাইস চেয়ারম্যান খাবার বিতরণ তদারকি করছেন এমন স্থিরচিত্র এবং ভিডিও ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। 

নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনীর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গত শুক্রবার থেকে চলে আসা ভাসমান মানুষের লঙ্গরখানার চিত্র এগুলো। প্রতিদিন এখানে খাবার গ্রহণ করেন ১৫০-১৮০জন। না লঙ্গরখানার ছবিগুলো ভাইরাল হয়নি, শুধুমাত্র আয়োজন সংশ্লিষ্টদের ফেসবুক আইডি এবং তাঁদের দু’একজন সুহৃদ ও সংগঠন শেয়ার দিয়েছেন এই পর্যন্তই। প্রথমআলোসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে স্থান পেয়েছে এই মহতি উদ্যোগের খবর। পুরো আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবীরা দেখিয়েছে খাবার নিতে আসা মানুষদের প্রতি মমত্ববোধ, শৃঙ্খলা, জীবানুমুক্ত ও দুরত্ব বজায় রাখার মতো সতকর্তা এবং উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা ও অভূতপূর্ব সমন্বয়।

যতোদিন লকডাউন থাকে ততোদিন লঙ্গরখানা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় শোনা গেলো উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বাদশার কন্ঠে। স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের কাজে কোন ত্রুটি থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিতেও ভুলে যাননি।

উপজেলা পরিষদ ও স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার প্রধান বণিজ্যকেন্দ্রক চৌমুহনীর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বিপুল সংখ্যক ভাসমান মানুষ দিনের বেলায় অবস্থান করেন এবং রাত্রিযাপন করেন। দিনে আয়রোজগা করে হোটেলে কিংবা মানুষের বাসাবাড়িতে খাবার খেয়ে রাত্রে ঘুমায় প্ল্যাটফর্মে। করোনা সংক্রমন ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশের ন্যায় চৌমুহনীতেও খাবার হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একইসাথে দোকানপাঠ বন্ধ হয়ে পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়ে এই ভাসমান মানুষগুলো। একদিকে আয়-রোজগার বন্ধ অপরদিকে হোটেল রেস্তোরাঁও বন্ধ। এমতাবস্তায় বিপাকে পড়ে এই মানুষগুলো। 

সংকটকালীন সময়ে এই ভাসমান মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। সহযোগীতায় এগিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “আমরা গোলাপ”। গড়ে তোলা হয় ভাসমান মানুষদের জন্য “লঙ্গরখানা”।  উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্বাবধানে কার্যক্রমটি চালিয়ে নিতে “আমরা গোলাপ” এর ১৫জন স্বেচ্ছাসেবী। খাবার সামগ্রী বাজার করে আনার পার সেগুলো রান্না করে দিচ্ছেন পাশ্ববর্তী কয়েকজন মহৎপ্রাণ নারী। এ কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছেন কিছু মহৎপ্রাণ ব্যাক্তিও কিন্তু তাঁরা আসতে চান না আলোচনায়। খাবার প্রদানের পূর্বে দুরত্বের চিহ্নগুলোসহ পুরো প্ল্যাটফর্ম জীবানুনাশক ছিটিয়ে জীবানুমুক্ত করা হয়। খাবার গ্রহণকারীরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তারপর খাবার নেন। স্বেচ্ছাসেবীদের রয়েছে সুরক্ষা সামগ্রী। খাবার প্রদানের সময় এবং আগে পরে উপস্থিত থেকে তদারকি এবং স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহ দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বাদশা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নুর হোসেন মাসুদসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ।

গত ৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই লঙ্গরখানায় প্রতিদিন ১৫০-১৮০জন খাবার গ্রহণ করছেন। এই ৫দিনের মধ্যে আবার ৩দিন দুইবেলা করে খাবার দেওয়া হয়। মঙ্গলবার পঞ্চম দিনে আয়োজনে সহযোগিতা করে “ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন”। উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এটি চালিয়ে নেওয়া সহজসাধ্য হতে পারে।

স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন- বেশীরভাগ খাবার গ্রহীতা প্রতিদিনই আসছেন। নারী, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের এই ভাসমান মানুষকে পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহের চেষ্টা করা হয়। যথারীতি খাবার খেয়েও তৃপ্ত এই ভাসমান মানুষগুলো।

পঞ্চম দিনের খাবারের একটি ভিডিও আপলোড করে নিজের ফেসবুক আইডিতে আয়োজন ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবী শাহেদ মুনীম ফয়সাল। তাঁর স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো এখানে ” পঞ্চম দিনে ভাসমান মানুষের জন্য উন্মুক্ত ভোজন কর্মসূচি "লঙ্গরখানা"  কিছু ভুল ত্রুটি হয়তো আমাদের হচ্ছে। সমালোচনা না করে সহযোগিতা করুন। আমরাও আমাদের ত্রুটি সংশোধনে সচেতন আছি। স্থানঃ চৌমুহনী রেলওয়ে স্টেশন, নোয়াখালী।”

আয়োজন সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম সাংবাদিকদের বলেন- শুক্রবার থেকে চালু হওয়া লঙ্গরখানায় দুপুরে ও রাতে দুইবেলায় খাবার দেওয়া হয়। প্রথমদিনে ১০০ জনকে খাবার দেওয়া হয়েছিলো। এই সংখ্যা এখন বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লঙ্গরখানা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা রয়েছে।

সার্বিক বিষয়টি নিয়ে প্রবাসে নোয়াখালী’র পক্ষ থেকে কথা হয় বেগমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বাদশার সাথে। তিনি বলেন- ভাসমান মানুষদের কথা বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে খাবার সরবরাহের কথা মাথায় রেখে লঙ্গরখানাটি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। মানবিক এই কাজটি চালিয়ে যাওয়া প্রশাসন একার পক্ষে এটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। মহতি এই উদ্যোগের সাথে তিনি সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন। 

তিনি বলেন- উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগটি আয়োজন সহযোগী হিসাবে পরিচালনা করছে স্বেচ্ছাব্রতিদের সংগঠন “আমরা গোলাপ”। সমাজকে তরুনদের এমন অংশগ্রহণ সত্যি অভূতপূর্ব। মানবিক এই উদ্যোগে তরুনদের সাড়া তরুন ও যুব সমাজের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

যতোদিন লকডাউন থাকে ততদিন এই ভাসমান মানুষদের লঙ্গরখানা চালু থাকবে বলে জানান তিনি।



মন্তব্য লিখুন :