সংকটে সহযাত্রী, পরিচয় শুধুই প্রবাসী

সময়ের কাঁটার সাথে ছুটে চলা বিশ্বের প্রতাপশালী নগরী নিউইয়র্ক করোণার ছোবলে পরিণত হয়েছিলো লাশের নগরীতে। যার ঢেউ আঁছড়ে পড়ে বাংলাদেশী কমিউিনিটিতেও। এখনো থামেনি লাশের মিছিল, থেমে থেমে বাংলাদেশী প্রবাসী কমিউনিটিতেও মৃত্যুর খবর আসে। শোকে মুহ্যমান নিউইয়র্কের প্রবাসী কমিউিনিটিতে এই সংকটকালীন সময়েও দেখাগেছে ভ্রাতৃত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত। সামর্থ্য অনুযায়ী একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এসব নিয়ে লিখেছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক রুদ্র মাসুদ

--------------

শীতের শেষ দিকে যখন প্রকৃতিতে রুক্ষতা হারাতে শুরু করেছিলো সবেমাত্র, তখনই আঘাত হানে অদৃশ্য ঘাতক করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯)। ধীরে ধীরে ভয় আর আতংকের নগরী থেকে মৃতপুরীতে পরিণত হয় সদাকর্মচঞ্চল নির্ঘুমের নগরী নিউইর্য়ক। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে মৃতের সংখ্যা, মৃতের তালিকায় যুক্ত হয় অসংখ্য প্রিয়মুখ। ঘন্টা মেপে যে শহরে মানুষ কাজের জন্য ছুটে সেই শহরের মানুষ দিনের পর দিন স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বরণ করেছেন জীবন বাঁচানোর তাগিদে। চাকরি, খাবার কিংবা ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আগ্রহ হারিয়েছিলেন অনেকে। শুধু একটাই প্রার্থনা মহান সৃষ্টিকর্তা যেনো সবাইকে রক্ষা করেন। হাসপাতাল আর নার্সিং হোমগুলোতে লাশের স্তুপ। বাইরে অপেক্ষমান ভ্রাম্যমান মর্গগুলোতেও লাশ সংকুলান হচ্ছিলোনা একসময়। মৃতদেহের ভারে ন্যুব্জ নগরীতে এই অবস্থায়ও কোন প্রবাসীকে গণকবরে ঠাঁই নিতে হয়নি, এমনটাই মত কমিউিনিটি নেতাদের। ধর্মীয় রীতিতে দাফন এবং সৎকরা করা হয়েছে নিহতদের। নিরূপায় সময়ে প্রবাসী পরিচয়েই একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক অভূতপূর্ব সহানভূতিশীল কমিউনিটি দেখেছে প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

করোনার রাজত্বে ক্রমেই বিশ্বের দাপটশালী নগরী থেকে নিউইয়র্ক হয়ে উঠে বিশ্বের অন্যতম পর্যদুস্থ নগরী। শুধু নিজে বেঁচে থাকার সকল প্রচেষ্টাই নয়, আক্রান্ত মানুষের সেবা আর মৃতদের সৎকারে রীতিমতো বিহ¦ল ছিলো নগরবাসী। চিকিৎসা সেবায় প্রানান্তকর চেষ্টার পাশাপাশি নিউইয়র্ক সিটি, স্টেট এবং ফেডারেল সরকারের নানামুখী সহায়তাও আস্থা হারিয়ে দেয় প্রতিদিনের মৃতের সংখ্যা। এলাকা থেকে এলাকায় দাফিয়ে বেড়ানো এম্বুলেন্সগুলোর সাইরেন আরো বেশী আতংকিত করেছিলো নাগরিক জীবনে। আতংকের মাঝেই নগরবাসীর দুয়ারে এসে দাঁড়ায় বসন্ত। নিউইয়র্কের প্রকৃতি এখন মনোরম সাজে। কিন্তু যে মানুষগুলো গাছ লাগিয়ে প্রকৃতিতে বাড়তি সৌন্দর্য্য যুক্ত করতেন, এবার সেটা অনুপস্থিত। ফলে বসন্তের সৌন্দর্য্যটুকু গত ৫ বছরে যেভাবে দেখেছি এবার সেটা মনে হয়নি। দীর্ঘদিন পর গত দুই সাপ্তাহের প্রখর রোদে বেরিয়েই সেটা অনুভূত হলো। তবে; রাস্তায় ক্রমেই বাড়ছে মানুষের কোলাহল, গাড়ির সংখ্যা। ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশী গ্রোসারিগুলোতেও ভীড় বাড়ছে হুহু করে। এই ভীড় নিজস্ব আঙ্গিকে ঈদ নিয়ে প্রবাসী পরিবারগুলোর ব্যস্ততা প্রমান করে।

নিউইয়র্কে প্রথম বাংলাদেশী কমিউটিতে মৃত্যুর খবর আসে ২০ মার্চ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মৃতের সংখ্যা প্রায় আড়াইশ পেরিয়েছে মে’র দ্বিতীয় সাপ্তাহেই। অল্পকয়েক জন অন্যান্য স্টেটের বাদ দিলে বাকী প্রায় সবাই নিউইয়র্কের। মৃতের যখন এই অবস্থা আক্রান্তের হিসাব রাখার সুযোগ কোথায় ? ৩-৪ দশক ধরে নিউইয়র্কে ব্যবসা করে এমন প্রবীন ব্যাক্তিত্ব, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট, ব্যাবসায়ী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, মুয়াজ্জিন, প্রযুক্তিবিদ, নিউইয়র্ক পুলিশের কর্মকর্তা, এমটিএ কর্মকর্তা, ব্যাংকার, গৃহিনী থেকে শুরু করে নানান বয়সের এবং শ্রেণী পেশার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসীদের আম্ব্রেলা সংগঠন হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ, সদসদ্য আজাদ বাকীসহ কমিউিনিটির অগণিত পরিচিত মুখকে হারিয়েছে নিউইয়র্ক প্রবাসীরা। এখনো থেমে থেমে আসে মৃত্যুর খবর। এই তালিকা আরো কতো দীর্ঘ হয় সেটি মহান আল্লাহই একমাত্র জানেন।

২২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া লগডাউনের আগে থেকেই অনেকেই কাজ ছেড়ে ঘরে চলে আসেন। সরকারের নগদ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি খাবারের সহযোগীতা নগরবাসীকে স্বস্তি দিলেও মৃত্যু আর আক্রান্তের হিসাবে অনিশ্চয়তা ভর করে প্রবাসীদের মাঝে। অভাবনীয় বিষয় হচ্ছে এসবের মধ্যেই সমানতালে চলতে থাকে সামাজিক ও স্বেচ্ছাব্রত কার্যক্রম। এই সংকটেও রাস্তায় নেমে স্বাভাবিক সময়ের মতোই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সামাজিক সংগঠনগুলো, নিইউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষদ্র সংগঠন ও ইসলামী সংগঠনগুলো এবং পরিচিত সংগঠকবৃন্দ। সহযোদ্ধাদের হারিয়েও মনোবল অটুট থাকা রীতিমতো বিস্ময়কর। শুধু সংগঠন নয়, তরুন-যুবা-বয়োজেষ্ঠ্যদের অনেকেই নিজ উদ্যোগে চালু করেছেন হেল্পলাইন, তারপরও আতংক কাটেনা যেনো অদৃশ্য শত্রুর ছোবলের।  

তারওপর অনেক পরিবারে আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে সংকট না থাকলেও গ্রোসারি দুরবর্তী হওয়ার কারণে, নিজস্ব গাড়ি না থাকার কারণে কিংবা বাজার করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ার মতো বিষয় রয়েছে। বাসায় খাবার ফুরিয়ে গেছে কিনা, টাকা লাগবে কিনা, যে কোন প্রয়োজনে ফোন করবেন এজাতীয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিরর্ভরতার কথা ঘুরেছে কমিউনিটিতে। কেউ কেউ সরাসরি না বললেও ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে রেখেছেন। সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যুনতম কিছু পরিবারকে সহযোগীতা করা যায়, কাগজপত্র নেই এমন পরিবারের পাশেও যদি দাঁড়ানো যায়।

এরমধ্যে বরকতময় পবিত্র মাহে রমজান আসে। এবার মসজিদে মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা না হলেও এলাকায় এলাকায় মসজিদ থেকেও খাদ্য উপহার বিতরণ করা হয়েছে, বাড়িতে বাড়িতেও খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন মসজিদ কমিটির লোকজন। এমন উদাহরণ নেহায়েত কম নয়। ইফতার এবং ঈদের জন্য খাবারের উপহার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে। ঝুঁকি নিয়েও জ্যাকসন হাইটস্, জামাইকা, চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড, পার্কচেষ্টার, ইউক্লিড-ওজনপার্কসহ বিভিন্ন এলাকায় খাবার বিতরণ করা হয়। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ছিলো আনডকুমেন্ট পরিবারগুলো। বাসায় বাসায় গিয়ে সরকারি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝেও খাবার পৌঁছাতে দেখা গেছে। একইভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এখানকার বিভিন্ন কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করে নিজস্ব আঙ্গিকে।

রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়ে হালাল খাবার সরবরাহের বিষয়টিও মুসলমানদের জানিয়েছেন সিটি মেয়র। পরিস্থিতি উত্তরণে নিজে সরাসরি মাঠে রয়েছেন গভর্ণর অ্যান্ড্রু কুমোও। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল প্রবাসী বাংলাদেশী চিকিৎসকদের সহায়তায় পুল গঠন করেছে জরুরী সেবা গ্রহণের জন্য। সার্বক্ষণিক আপডেট জানাতে সক্রিয় বাঙলা সংবাদমাধ্যমগুলো এবং ঝূকি নিয়ে মাঠে সক্রিয় গণমাধ্যমকর্মীরা। করোনা সংচেতনতায় ডা. ফেরদৌস খন্দকারের প্রতিদিনকার দুই বেলার লাইভ কর্মসূচী ব্যাপক সাড়া ফেলে। সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটর্ণি এবং সার্টিফাইড পাবালিক একাউন্টেন্টদের (সিপিএ) অনলাইন পরামর্শ সহায়ক হয় কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষদের জন্য।

হাসপাতালে মারা যাওয়ার ব্যাক্তির সঠিক তথ্যটুকুও পেতেও নানা ভোগান্তি রয়েছে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। স্বজনের লাশ গ্রহণ, পরবর্তীতে দাফন কিংবা সৎকারের উদ্যোগ নিতে পেরুতে হয় অনেক ধাপ। এমন শোকাতুর কমিউনিটিত মৃত্যুবরণকারী প্রবাসীর দাফনের বিষয়টি সবচে বেশী গুরুত্ববহন করে। বাংলাদেশ সোসাইটিসহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এবং মসজিদ ভিত্তিক সংগঠনের নিজস্ব কবরস্থানে মৃতদের দাফন সম্পন্নহয়। কারো কারো কবরের জায়গা আগেই কিনে রাখা ছিলো, কেউ এখন মূল্য পরিশোধ করেছেন। তবে; বেশীরভাগ প্রবাসীকেই বিনামূল্যে কবরের জায়গা প্রদান করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি। নিউজার্সির মার্লবোরো এবং নিউজার্সি স্টেট মেমোরিয়োলে সাসাইটির কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে শতাধিক মৃতদেহ। সনাতনধর্মীদের পাশেও দাঁড়িয়েছে সোসাইটি। যাদের সবাই কিন্তু সদস্য ছিলোনা। ইতোমধ্যে ক’দিন আগেও কমিউনিটিতে যেখানে কাঁদা ছোড়াছুড়ি ছিলো সেখানে এখন সবাই এক কাঁতারে। 

রোববার (১৭ মে) পর্যন্ত হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারী ৩৬জন প্রবাসীর মৃতদেহ ফিনারেল হোম হয়ে দাফনের কাজের অগ্রভাবে থাকা বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনক্ এর সেক্রেটারি জাহিদ মিন্টুর ভাষ্য অনুযায় সবাই তাঁর এলাকার ছিলেন না। পরিচয় শুধু বাংলাদেশী প্রবাসী, তাই সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। নিজেদের কবরস্থানে সদস্যদের দাফনের পর অন্যদের বাংলাদেশ সোসাইটির কবরস্থানে দাফন করা হয়। এই সময়ে বাংলাদেশ সোসাইটি তাঁদের সামর্থ্য দিয়ে যেমন এগিয়ে এসেছে,এটি অনেক বড় বিষয়।

বাংলাদেশ সোসাইটির কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে রোববার (১৭ মে) পর্যন্ত ১২৭জনকে।  যাদের মধ্যে ১২৩ জনকে  দাফন করা হয় নিউজার্সির মার্লবোরোতে। সোসাইটি যেমন এগিয়ে এসেছে তেমনি সামর্থ্যবানরাও এগিয়ে এসেছেন আর্থিক সহায়তা দিয়ে। পারস্পরিক এই সমমর্মিতার দরুন এখনো গণকবরে কোন প্রবাসীর দাফন করতে হয়নি বলে সোসাইটির সেক্রেটারির ভাষ্য। তারপরও নিউইয়র্ক সিটির কোন হাসপাতালে কোন প্রবাসীর বেওয়ারিশ লাশ থাকলে সেটি দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে রেখেছেন। মুসলমানদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মের প্রবাসীদের সৎকারেও একইভাবে সহযোগীতা রয়েছে।

দাফন সংক্রান্ত অসংখ্য সংগঠন নিজেদের সামর্র্থ্য অনুযায়ী কাজ করলেও বাস্তবতা বুঝার জন্য ছোট দুটি তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে শুধু। যার ফলে গণকবর এড়ানো গেছে প্রবাসীদের দাফনে।

ব্যাতিক্রমও আছে-

করোনায় বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যার চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশী। করোনার আঘাতে বিধ্বস্থ কমিউনিটি যখন শোকাতুর আবহ এবং আতংক তখনও নেতিবাচক কর্মকান্ডেরও অভাব নেই। নানান সমালোচনাতো রয়েছেই, আছে লোভী প্রচেষ্টাও। কাগজপত্র নেই এমন পরিবারগুলোর পাশে নানাভাবে সহযোগীতার উদ্যোগ চলছে ভেতরে ভেতরে, তখন যাদের সামর্থ্য আছে এমন কেউ কেউ দুঃখজনক আচরণ করছেন। বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ফেসবুক সাংবাদিকতাও। আতংক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি জীবিত ব্যাক্তিকে মৃত বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াসহ নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর লোকেরও অভাব নেই।



মন্তব্য লিখুন :