প্রাণচাঞ্চল্য ফিরছে নিউইয়র্কে

বেড়ানোর জায়গাগুলোতে উপচে পড়া ভীড়

সৎকারের অপেক্ষায় নিউইয়র্কে এখনো ফ্রিজার ট্রাকে পড়ে আছে একবছরের পুরোনো মরদেহ। যাদিও প্রতিদিন বাড়ছে নাগরিকদের ভ্যাকসিন গ্রহণের হার, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মাস্ক ব্যবহারে কিছুটা শিথিলতা দেখালেও করোনার সংক্রমন থেকে রেহাই পেতে মাস্ক ব্যবহারে সতর্ক সাধারণ মানুষ। ভ্যাকসিন গ্রহণের হারবাড়াতে সরকার নানা উপঢৌকন ও লটারির ঘোষনাও দিয়েছেন। এসবের মাঝেও করোনার নীল দংশনে স্থবির বিশ্বের শীর্ষ নগরী থেকে ক্রমেই মুক্তির স্বাদ পেতে ব্যাকুল নিউইয়র্ক নগরবাসী। একটু তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথেই পুরোনো চেহারায় ফিরতে চাইছে নগরী। 

ছুটির দিনে বীচ, পার্ক, চিড়িয়াখানাসহ বেড়ানোর স্থানগুলোতে উপচে পড়া ভীড়। বাঙালী কমিউনিটিতে পিকনিক আয়োজনের রীতিমতো প্রতিযোগীতা চলছে। মিউজিয়ামে প্রবেশেও দর্শণার্থীদের লম্বা লাইন দেখা গেছে। কেউ কেউ গাড়ি নিয়ে ছুটছে নিউইয়র্ক সিটির বাইরের কাউন্টিগুলো কিংবা ভিন্ন স্টেটের দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরতে। কেউ কেউ  বেড়াতে বেরিয়েছেন প্রায় দেড় বছর পর। 

কমিউনিটিগুলো ব্যাস্ত বারবিকিউ পার্টি, পিকনিকসহ নানা আয়োজন নিয়ে। রোস্তার-বারগুলোতে ক্রমেই ভীড় বাড়ছে। বাস-ট্রেণের পাশপাশি যাত্রী বেড়েছে ক্যাবে। কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতির হারও বাড়ছে লক্ষ্যনীয় মাত্রায়।  স্ট্রিট, এভিনিউ ছাড়িয়ে যানজটের পুরোনা চেহারা দেখা মিলছে হাইওয়েতেও যেনো এক মৃতুপূরীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।

নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ২৩ মে পর্যন্ত সরাসরি করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিটিতে মৃতের সংখ্যা ২৮ হাজার ০৪১। আর করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৪ জন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানীর চিত্র কিংবা করোনারা ভয়াবহতা সময়ের কাঁটার সাথে ছুটে চলা এই নগরে কতটা শূণ্যতা সৃষ্টি করেছে তা সহজেই বুঝিয়ে দেয় ম্যানহাটনের আবাসিক ভবনগুলোতে ঝুলতে থাকা ভাড়ার বিজ্ঞপ্তিগুলো। 

তবে; দ্রুতগতিতে নাগরিকদের ভ্যাকসিন গ্রহণের প্রবণতা আশার সঞ্চার করছে নাগরিক জীবনে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে- ২২ মে পর্যন্ত অন্তত এক ডোজ টিকা নিয়েছেন ৪৯ শতাংশ মানুষ আর দুই ডোজ টিকা গ্রহীতার সংখ্যা ৪১ শতাংশ বা ৩৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪৪জন। টিকা গ্রহণের হার বৃদ্ধি এবং গড়পড়তা তাপমাত্রার মাঝেই গত ১৩ মে থেকে উর্ধ্বমুখী তাপমাত্রার কারণেই ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে নগরবাসী। যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচা।

ঘুরে দেখা গেছে- ছুটির দিন হলেও  শনিবার এবং রোববার কর্মদিবসের চেয়েও বেশী ভীড় ছিলো নিউইয়র্ক সিটির সাবওয়ে এবং বাসে। বেড়ানোর জায়গা অভিমুখী সড়কে ব্যাক্তিগত গাড়ির জটলাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। নগরীর বৃহত্তম বিনোদনের স্থান সেন্ট্রাল পার্ক, প্রসপেক্ট পার্ক, ফরেস্ট হিল, ব্রুকলিন ব্রিজ, কোনি আইল্যান্ড বিচ, রকওয়ে বিচ, স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ব্রংকস্ জু, নিউইয়র্ক এ্যাকুরিয়ামসহ বেড়ানোর জায়গাগুলোতে ছিলো মানুষের ভীড়। কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন রিভার ক্রুজের মতো উপভোগ্য ভ্রমণও। বেড়ানোর এই তালিকায় পারিবারিক ভ্রমনই বেশী দেখা গেছে।

শুধু বেড়ানোর স্থানই নয়, ভীড় ছিলো মিউজিয়ামেও। ম্যানহাটনের দ্যা মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট এ প্রবেশ করতে  সামাজিক দূরত্ব মেনে দর্শণার্থীদের দীর্ঘ লাইন মনে করিয়ে দেয় নগবাসীর কতোটা উদগ্রীব হয়ে আছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে।

নগরীর বৃহত্তম সেন্ট্রাল পার্কে পিকনিক, জন্মদিনের পার্টি, গ্র্যাজুয়েশন পার্টিসহ নানান পার্টির আয়োজন ছিলো চোখে পড়ার মতো। ছোটদের মাছ, কচ্ছপ, ফুল, পাখির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখো গেছে অভিভাবকদের। নবদম্পতির বিয়ের ছবি তোলা। সুর্য্য¯œান কিংবা প্রখর রোধে ধ্যান কিংবা মেডিটেশন করতেও দেখা গেছে আগত দর্শণার্থীদের। লেকে নৌকা ভ্রমন, মাঠে খোলাধুলায় মেতে ছিলে তরুন-তরুনীরা।

ম্যানহাটনের হৃৎপিন্ড সেন্ট্রাল পার্কের নর্থ উডের শান্ত ঝর্ণা, কনজার্ভেটরি গার্ডেন, স্ট্রভেরি ফিল্ড, চেরি হিল, পিলগ্রিম হিলসহ বেড়ানোর স্পটগুলোতে ঘোরাঘুরি করে যেনো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে দর্শণার্থীরা। টল ফ্যামিলি প্লে-গ্রাউন্ড, সাফারি প্লে-গ্রাউন্ডসহ ছোটদের বিনোদন স্পটগুলো ছিলো শিশুদের কলকাকালিতে মুখরিত। লেকগুলোতে মৎস শিকার এবং নৌকা ভ্রমণে যেনো আনন্দের শেষ নেই। সবচে বেশী মানুষের জড়ো হয়েছে পার্কের কেন্দ্রে অবস্থিত গ্রেট লনে। বিশাল এই মাঠের চারপাশে অগণিত পার্টি চলেছে দিনভর। বেড়াতে আসাদের মধ্যে বাংলাদেশী পরিবারের সংখ্যাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। আর বেড়ানোর স্থানগুলোতে আগত দর্শণার্থীদের বিনোদন দিতে মিউজিক্যাল পাটিগুলো বিরতিহীনভাবে গান এবং বাজনা পরিবেশন করেছেন বিরতিহীনভাবে।

ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে আসা বাংলাদেশী আমেরিকান কানিজ সুলতানা রীতিমতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে ২০১৯ এর সামারে সর্বশেষ বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। করোনার সংক্রমন শুরুর হবার পর তিনি নিজে এবং সন্তানদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে বের হননি। সেই হিসাবে দেড় বছরেরও বেশী সময় পর বেড়াতে বের হন। সন্তানদেরকে প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছেন। সবচে বড়কথা নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে যেনো বহুদিন পর। সবাই যারযার মতো আনন্দ করছে, এটা দেখে ভালো লাগলো।

ক্যাবি মোহাম্মদ হোসেন জানালেন- ক্রমেই যাত্রী বাড়ছে হলুদ ট্যাক্সি এবং উবার-লিফট্ এর মতো অ্যাপস্ নির্ভর ক্যাবেও। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষজন ঘর ছেড়ে বের হচ্ছে যাত্রী বৃদ্ধির প্রবণতা সেটাই প্রমান করে।


মন্তব্য লিখুন :