তরুন ডেলিভারি বাইকার বরকতের মৃত্যু

রাস্তায় রক্তের স্রোতে স্বপ্নের শবযাত্রা

জানাজা শেষে সবাই শেষবারের মতো একবার দেখছেন কারচাপায় নিহত তরুন ডেলিভারি বাইকার (ইনসেটে) বরকত উল্যা মুন্নার মরদেহ। ছবি-রুদ্র মাসুদ।

ম্যানহাটনের ডাউনটাউনের ব্যাস্ততম ইস্ট হিউস্টন ও ক্লিন্টন স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে নিজের বাইক নিয়ে হেটে রাস্তা পার হচ্ছিলেন বরকত উল্যাহ মুন্না (২৩)। এসময় পুলিশের তাড়ায় পলায়নপর একটি দ্রুতগামী কারের সজোরো ধাক্কায় সাইকেলসহ ছিটকে পড়েন তিনি। মুহুর্তেই রাস্তায় রক্তের স্রোত নামে। এটি দেখে গাড়ি থামিয়ে মুন্নার শুশ্রুষায় নিয়োজিত হয় পুলিশ । দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় ম্যানহাটনের বেলভিউ হাসপাতালে। ততক্ষণে মৃত্যু তাঁকে আলিঙ্গন করে।

গত ৮ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রথম দিকে এটি বিদ্বেষপ্রসূত হামলা হিসাবে প্রচার পায়। কেউ কেউ দূর্ঘটনার জন্য ফুড ডেলিভারি বাইকারদের অসচেতনাকে দায়ী করে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অথচ; বরকত গ্রীন সিগন্যালে থাকা অবস্থায়ই রাস্তার পার হচ্ছিলেন। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ইস্ট হিউস্টন ও ক্লিন্টন স্ট্রিটের ক্রসিংয়ের সেই মর্মান্তিক দূর্ঘটনার ১মিনিট ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সকল প্রশ্নের উত্তর মেলে, শোকে স্তব্দ হয়ে পড়ে স্বজন,সহকর্মী,বন্ধুসহ পুরো কমিউনিটি।

রেড লাইটের সিগন্যাল অমান্য করে ছুটে যাওয়া কারের ধাক্কায় বরকতের ছিটকে পড়ার দৃশ্যটি হলিউডের কোন এ্যাকশন মুভির দৃশ্যকেও হারা মানায়। এরসাথে ছিটকে পড়ে সোনালী ভবিষ্যৎ গড়ার এক যুথবদ্ধ স্বপ্নও। যে স্বপ্নের সারথি ছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার দেউটি ইউনিয়নের নবগ্রাম গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোনেরাও। ভিডিওতে রাস্তায় রক্তের স্রোত আর কফিনে চড়ে সেই স্বপ্নের শবযাত্রা দেখেছে রোববার (১১জুলাই) সন্ধ্যায় ম্যানহাটন হাউন টাউনের আস্সাফা ইসলামিক সেন্টারে মুন্নার জানাজায় আসা শোকার্ত মানুষ।

বরকত উল্যা মুন্নার জানাজায় অংশ নেন বিপুল সংখ্যক তরুন-যুবক। যাদের বেশীরভাগই নিউইয়র্ক নগরীতে ক্রমবিকশমান স্বাধীন পেশা ফুড ডেলিভারির সাথে সম্পৃক্ত। ৩ বছর পূর্বে নিউইয়র্কে আসার পর থেকে কাজের পাশাপাশি কমিউনিটেতে খেলাধুলা থেকে শুরু করে নানান কর্মকান্ডে নিবিড়ভাবে সম্পৃত ছিলেন তিনি। ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডে থাকলেও কাজ এবং আড্ডায় বেশীরভাগ সময় ব্যায় করতেন ম্যানহাটনের ডাউনটাউনে। মুসুল্লী ছিলেন আসসাফা মসজিদের। মসজিদের কাজে স্বেচ্ছাব্রতি হিসাবে নিজেকে নিয়োজতি রেখেছিলেন। জানাজা পূর্ব আলোচনায় মসজিদ কমিটির সেক্রেটারির কন্ঠে সেটা ফুটে উঠে।

জানাজার পূর্বে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচানায় অংশ নেন বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনক্ এর সভাপতি নাজমুল হাসান মানিক, বৃহত্তর বেগমগঞ্জ সোসইটির সভাপতি গোলাম সারোয়ার, বরকতের ভাই ফয়েজ উল্যা, আস্সাফা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুলতান আহমেদ জসিম, জেঠাতো ভাই মোরশেদ আলম, জেঠাতো ভাই ও রুম মেট আহসান মামুন, এনওয়াইপিডির দুই কর্মকর্তা, বরকতের বন্ধু-সহকর্মী রুবেল প্রমুখ। দোয়া পরিচালনা এবং জানাজায় ইমামতি করেন মসজিদের ইমাম মাওলানা রফিক আহমেদ।

বরকতের রুমমেট-স্বজন আহসান মামুন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন- বৃহস্পতিবার (৮জুলাই) বিকালে বৃষ্টি হচ্ছিলো। এরমধ্যে বরকত বাসা থেকে বের হতে চাইলে তিনি জানতে চেয়েছিলেন কোথায় যায়? উত্তরে বলেছিলো মন ভালো নেই ভাই, কাজ করবেনা। একটু ম্যানহাটন থেকে ঘুরে চলে আসবে। সেই ছিলো তাঁর শেষ যাওয়া, আর বাসায় ফেরা হয়নি। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর খবর পাই আমরা। 

জানাজায় বক্তব্যে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং কমিউিনিটি নেতৃবৃন্দ বারবার ফুড ডেলিবারি বাইকারদেরকে হেলমেটসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার, সিগন্যাল মান্য করাসহ নিয়ম মেনে বাইক চালানোর জন্য অনুরোধ করেন। নাহয় একটু অসাবধানতায়ই অকালে ঝরে যাবে বরকতের মতো অনেক তাজা প্রাণ।

জানাজার পর শোকার্ত মানুষ যখন শেষবারের মতো কফিনে বরকত উল্যাহ মুন্নাকে একনজর দেখছিলেত তখন বিলাপ করতে করতেই বারবার মূর্চা যাচ্ছিলেন তাঁর বড় ভাই ফয়েজ উল্যা। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলছিলেন কেনো তার আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো প্রিয় ছোট ভাই। ছোটভাই’র জন্য সবার দোয়া কামনা করেন তিনি।

স্বজনরা জানায়, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার দেউটি ইউনিয়নের নবগ্রাম গ্রামের মালের বাড়ির জালাল আহম্মদের দুই ছেলে দুই মেয়ে। বরকত ছেলেদের মধ্যে ছোট। ৩ বছর পূর্বে সহায় সম্বল বিক্রি-বন্ধক রেখে স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। দ্রুতগামী কার চাপায় তাঁর স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি ঘটে। ১২ জুলাই রাত ১১টায় এমিরেটস্ এয়ারলাইনসের বিমানে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে নবগ্রাম মসজিদের কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মন্তব্য লিখুন :