নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের কিডনি বিভাগ

বেড ও মেশিন সংকটে ডায়ালাইসি সেবা না নিয়েই ফিরতে হচ্ছে অনেককে

নোয়াখালীতে দিন দিন কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যাদের বেশিরভাগকেই প্রতিনিয়ত ডায়ালাইসিস সেবা নিতে হচ্ছে। ব্যয়বহুল এ চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে অনেক অসহায় পরিবার নি:স্ব হচ্ছে। হাতের কাছে নোয়াখালী সরকারি জেনারেল হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে এ সেবার সুবিধা থাকলেও বেড ও মেশিন স্বল্পতার কারণে অনেকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে; কতৃপক্ষের দাবী সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তাঁরা। 

ডায়ালাইসিস ইউনিট সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর পূর্বে মাত্র ১০টি মেশিন নিয়ে আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের কিডনী বিভাগ ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের একটি কর্ণারে যুক্ত করে ডায়ালাইসিস ইউনিট। জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায় নির্মিত মেডিকেল কলেজে কোনো হাসপাতাল না থাকায় মূলত জেনারেল হাসপাতালে এটি স্থাপন করা হয়। গেল এক বছরে এ ইউনিট থেকে রোগীদের প্রায় ৮ হাজার সেশন ডায়ালাইসিস দেয়া হয়। প্রতিদিন তিন শিফটে ডায়ালাইসিস সেবা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কখনও সংকটাপন্ন রোগিদের রাতে বিশেষ ব্যবস্থায় এ সেবা দেয়া হয়। এখানে আধুনিক মেশিন, নিজস্ব ল্যাব ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও রয়েছে। সার্বক্ষণিক রয়েছে ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত নার্স। তবে সংকট রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর। অতিরিক্ত রোগী থাকলেও বেড ও মেশিন সংকটে অনেকে সেবা নিতে পারছেন না। 

সূত্র জানায়, শুধু নোয়াখালীর রোগীরাই এখানে সেবা নিতে আসেন না। পার্শ্ববর্তী জেলা ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার লাকসাম থেকে রোগীরা সেবা নিতে আসেন। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে যেখানে ব্যয় হচ্ছে আড়াই থেকে ৪ হাজার টাকা, সেখানে সরকারিভাবে মাত্র ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার নামমাত্র মূলে এ সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ডায়ালাইসিস ইউনিটে শতাধিক রোগির চাপ থাকে। কিন্তু তিনটি শিফটে দশটি বেডে প্রতিদিন ৩০জন রোগির বেশি সেবা দিতে পারছেন না তারা। বেড ও মেশিন না থাকায় প্রতিদিন চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে।

ডায়ালাইসিস ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ ও নার্স সোহাগী ¤্রং জানান, তারা সাধ্যের মধ্যে সবটুকু দিয়ে সেবা দিচ্ছেন। এখানে কর্মরত প্রত্যেকটি নার্স রোগিদের স্বজন ভেবেই সেবা দিচ্ছেন। লোকবল সংকটও রয়েছে তাদের। নার্সের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মির। অনেক সময় দেখা যায় নার্সরাই পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। তিনি বলেন, চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগি বা তার স্বজনরা ইউনিটের চিকিৎসা সেবায় কোনো গাফলতি পায়নি। তাদের যতটুকু সাধ্য আছে ততটুকুর মধ্যেই নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন। তবে মেশিন, বেড ও লোকবল সংকট হওয়ায় ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও সেবা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।

হাতিয়া থেকে আসা জামাল উদ্দিন নামে একজন রোগি জানান, তিনি ঢাকাতে ডায়ালাইসিস করতেন। কিছু দিন পর পর তাঁকে ডায়ালাইসিস সেবা নিতে হয়। এতে তিনি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। একটি ব্যবসা ছিল তাও ছেড়ে দিয়েছেন। ডায়ালায়সিস নিতে নিতে তিনি প্রায় নি:স্ব। বর্তমানে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে সেবা নিচ্ছেন তিনি। তবে এখানে সেবা নেয়ার জন্য তাকে অনেক সময় অক্ষোয় থাকতে হয়েছে। রোগির চাপ থাকায় সিরিয়াল পাননি। সিরিয়াল পেতে কষ্ট হলেও স্বল মূল্যে সেবা পাওয়ায় তিনি খুশি। একই সাথে এখানকার সেবায় সন্তুষ্টও। 

ফেনী থেকে আসা ওমর ফারুক জানান, যেহারে রোগি প্রতিদিন ফিরে যায় এতে মনে হচ্ছে এখানে অন্তত ৫০ বেডের ডায়ালায়সিস প্রয়োজন। তাহলে হয়তো রোগির কিছুটা চাপ সামলানো যাবে। তিনি দাবী করেন সরকার যদি এ হাসপাতালে কিডনির জন্য আলাদা স্থান দিয়ে সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেন তাহলে গরীব রোগিরা অন্তত আর্থিকভাবে বাঁচবে। 

একাধিক কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, জেলাতে শুধু কিডনি ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার। 

জানা যায়, নোয়াখালী জেলা স্বাচিপের সভাপতি ফজলে এলাহী খানের একক প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট যুক্ত হয়। মাত্র ১০টি মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু সেবার মান ভালো হওয়ায় এখানে দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জেলায় বেসরকারি ২-৩টি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা থাকলেও তা রোগী অনুপাতে অপ্রতুল। আবার ব্যয়বহুলও। 

জানতে চাইলে নোয়াখালী আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজী বিভাগের প্রধান ও সহকারি অধ্যাপক ফজলে এলাহী খান সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ইতোমধ্যে সংকট সমাধানে স্থানীয় সাংসদ একরামুল করিমসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে আশ্বাসও পেয়েছেন। হয়তো দ্রুত সময়ের মধ্যে জেনারেল হাসপাতালে স্থান নির্ধারণ পূর্বক আরো মেশিন সংযুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, মেশিন ও বেডের পাশাপাশি লোকবল সংকট দুর করা গেলে সরকারিভাবে ভালো সেবা নিতে পারবেন এ জেলার কিডনি রোগীরা। 

আক্রান্ত রোগীকে বহুবার ডায়ালাইসিস নিতে হয়। বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী ও স্বজনরা সর্বশান্ত হতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারিভাবে ডায়ালাইসিস সেন্টারে বেড ও মেশিন বাড়ানোর দাবী মরণব্যধী কিডনিরোগে আক্রান্ত ও তাদের স্বজনদের। 


মন্তব্য লিখুন :