নোয়াখালীর নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলারস্তুপ

১৭ বছরের পুরনো মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি

মামলা ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে অথচ বিচারকার্য শেষ হয়নি। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে আছে সাত হাজারেরও বেশী মামলা। এচিত্র নোয়াখালীর দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের। পাশাপাশি গত ৫ বছরে নিষ্পত্তিও হয়েছে ৪হাজার মামলার। এঅবস্থার জন্য জনবল সংকটকে সংশ্লিষ্টরা দায়ী করলেও বিচারকার্যের এমন ধীরগতি আস্থাহীনতা তৈরী করে বিচার প্রার্থীদের মাঝে । এজন্য আইনের সংশোধন এবং সেল গঠনের মাধম্যে তদারকি সর্বপরি সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা জোরদারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন আইনজীবি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের এক কলেজছাত্রীকে (১৯) নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতো সাইফুল ইসলাম ওরফে মাসুদ নামের এক যুবক। প্রস্তাব প্রত্যখান করায় ২০০২ সালের ১০ ডিসেম্বর সাইফুল ওই ছাত্রী ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনার দুইদিন পর ১২ ডিসেম্বর ছাত্রী নিজেই বাদী হয়ে সেনবাগ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি ধর্ষণের চেষ্টার ওই ঘটনার।

নোয়াখালীর দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের একটি মামলা চিত্র এটি। এরকম হাজার হাজার  মামলা বছরের পর পর বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে নোয়াখালীর দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। আদালত দুইটিতে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ১৩টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে অনেক মামলাই রয়েছে, বছরের পর বছর পার হয়েছে মামলার বিচার শেষ হয়নি।

অবশ্য আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সময়মত সাক্ষী হাজির না হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে বিচারকের শূণ্যতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে মামলার সংখ্যাধিক্যকেও দায়ী করা হচ্ছে। আর বিচারে এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য বিচারপ্রার্থীদের মাঝে আস্থাহীতনতা তৈরী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আইনজীবী ও নারী অধিকার কর্মীরা। 

এ প্রসঙ্গে নোয়াখালীর নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভীন বলেন, আদালতে মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে। বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরণের আস্থাহীনতা তৈরী হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি তদারকির জন্য সরকারিভাবে বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

আদালতের একটি সূত্র সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে জানায়, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৫টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন দায়েরকৃত প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মামলা বিচার কার্যক্রম চলমান আছে। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৭০০টি। সেখানে নোয়াখালীর দুইটি ট্রাইব্যুনালেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সাত হাজারের বেশি।

এদিকে মামলার এই সংখ্যাধিক্যের প্রেক্ষিতে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি লিখেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ সামস্ উদ্দীন খালেদ। গত ২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রেজিষ্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে চিঠিটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, নয়টি থানার (উপজেলা) বিপরীতে দুইটি ট্রাইব্যুনাল বিদ্যমান থাকায় মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে মামলার সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও অন্তত: দুইটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নোয়াখালীতে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনাল-১ এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০০২ সালে। আর ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। ট্রাইব্যুনাল-২ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। নতুন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর মামলার মোট সংখ্যা বেড়েছে আরও প্রায় ৫০০টি। 

জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এর অধীন সদর, কোম্পানীগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, চাটখিল ও সেনবাগ উপজেলা। আর ট্রাইব্যুনাল-২ এর অধীন কবিরহাট, সুবর্ণচর, হাতিয়া ও সোনাইমুড়ী উপজেলা। নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ট্রাইব্যুনাল-২ এ দুই হাজার ৪৭৭টি মামলা স্থানান্তর করা হয়। 

দুইটি ট্রাইব্যুনালের ষ্টেনোগ্রাফারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আদালত দুইটিতে নতুন মামলা দায়ের/স্থানান্তর হয়েছে সাত হাজার ৪২৬টি। আর একই সময়ে নিষ্পত্তি করা হয়েছে চার হাজার ৩৫৩টি। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম শুরুর পর গত ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত দেড় বছরে কেবলমাত্র ওই আদালতেই ৭২৬টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। 

তবে নিষ্পত্তি এই সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সরকারি কৌঁসুলী মামুনুর রশীদ লাভলু। তাঁর মতে, নিষ্পত্তি হওয়া বেশিরভাগ মামলাই পিটিশন মামলা। এক্ষেত্রে হয়ত নানা অসঙ্গতির কারণে আবেদন খারিজ হয়েছে কিংবা তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নিষ্পত্তি হয়েছে। সে হিসেবে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির হার কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নতুন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হলেও প্রয়োজনী জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে ট্রাইব্যুানালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হতে কিছুটা বিলম্ব হয়। আবার গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারকের পদ শূণ্য থাকায় সেখানে বিচার কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও তিনি নিজের ট্রাইব্যুনালকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। যার করণে এ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হারও বেশি। 

তবে ট্রাইব্যুনাল-১ এ সম্প্রতি নতুন একজন বিচারককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যিনি গত রোববার যোগদান করেই বিচারকার্য শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন ষ্টেনোগ্রাফার নজরুল ইসলাম।

জেলার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জেলা বারের সভাপতি মোল্লা হাবিবুর রছুল মামুন এ প্রসঙ্গে বলেন, নারী, শিশু নির্যাতদন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার জট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হল বিচার শেষের কোনো সময়সীমা না থাকা। সাক্ষীরা না এলে উপর্যুপরি তারিখই পড়ে, কিন্তু বিচার শেষ হয় না। এক্ষেত্রে আইনের সংশোধন প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী আরও বলেন, এখন ট্রাইব্যুনালে নারী, শিশু নির্যাতনের একেকটি মামলার তারিখ দেওয়া হয় পাঁচ-ছয় মাস পর। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের বিচারক যিনি থাকেন, তিনি যদি আরো আন্তরিকতার সহিত মামলার তারিখ দেন তাহলে তা মামলার জট কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


মন্তব্য লিখুন :