কভিড-১৯ পরীক্ষাকর্মীর বোধ

কাজই ধ্যান জ্ঞান, মারা গেলে নিথর দেহটাও এনাটমি বিভাগের

“কোভিড-১৯, যুদ্ধের ময়দানে আছি এবং থাকবো... মারা যাবো, তবুও কাজ থামবেনা... মৃত্যুর পর আমার নিথর দেহটা আমার কর্মস্থলে এনাটমি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসর্গ করে দিলাম”

নিজের ফেসবুক আইডিতে গত ২৪ মে ছোট্ট এই স্ট্যাটাসটুকু দিয়েছিলেন নোয়াখালী আব্দুল মালেক মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়েলজি বিভাগের মলিকুল্যার ল্যাবের ইনচার্জ সঞ্জিব পাল। কাজপাগল এই যুবকের ছোট্ট স্ট্যাটাসটি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক জুড়ে। শেয়ার দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রতিথযশা চিকিৎসক, চিকিৎসক নেতা, সহকর্মী, পরিচিত স্বজন, বন্ধুরা। 

শীতাতপ নিয়ন্ত্রন্ত্রিত কক্ষে পিপিই, গাউন, পোষাক পরে সিদ্ধ হবার উপক্রম হয়েও টানা ২৪ ঘন্টাও সহকর্মীদের সাথে কাজ করেছেন কোন কোন দিন। করোনা মহামারিতে উপসর্গ থাকা রোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনা তথা জীবানুর সাথে বসবাস করেও মনোবলে এতটকু ছিড় ধরেনি এই যুবকের। উল্টো নিজের দেহ যদি শিক্ষার্থীদের কোন কাজে লাগে তাই দান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ২৮ বছর বয়সের এই ল্যাব টেকনোলজিস্ট।

শিক্ষক পিতার সন্তান সঞ্জিব শুধু কাজকে নয় মানুষকেও সম্মান দিতে কার্পন্য করেন না। তারপরও কিছু মানুষ যেনো ভালো কাজকেও ভালো চোখে দেখেনা। কলেজের মলিকুল্যার ল্যাব এবং ল্যাবের পরীক্ষা নিয়ে কুৎসা রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ না ছেড়ে কিংবা কোন ধরণের বাদপ্রতিবাদে না গিয়ে বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার ওপর। গত ৯জুন তাঁর আইডিতে এমন একটি পোস্টও তিনি দিয়ে রাখেন। ১৩ জুন কাজ শেষে ঘর্মাক্ত পোষাকে ছোট্ট পোস্টে লিখেন “এ দাগ, এ ঘামের আদৌ অবসান হবে কি !!!!!”।

কলেজের ৬ তলায় মলিকুল্যার ল্যাবটির অবস্থান আর সঞ্জিব থাকেন ৫ তলায়। চিকিৎসক ছাড়াও তাঁদের পুরো টিমে তাঁরা ৬জন ল্যাব টেকনোলজিস্ট কাজ করেন, ৪জন ল্যাব এটেন্ডেন্ট, এমএলএসএস, কম্পিউটার অপরেটর, জেনারেটর , স্যানিটাইজার, লাইব্রেরীয়ান এটেন্ডেন্ট, ড্রাইভার, এনিমেল কেয়ারটেকার, স্টোরের দায়িত্বে থাকা কার্ডিওগ্রাফার। যিনি জেনারেটর চালুর প্রতি লক্ষ্য রাখেন তিনি সারাদিনই এক জায়গায় বসে থাকতে হয় কারণ কখন কারেন্ট চলে যাবে আর কতো দ্রুত জেনারেটরটি চালু দিতে হবে। এটি শুধু একটি উদাহরণ, পুরো টিমের বাকীদের দায়িত্বশীলতা বুঝতে যে কোন মানুষের এটুকু অনুধাবনই যথেষ্ট।

মেডিকেল কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- নোয়াখালীর এবং ফেনী মিলিয়ে ১৫টি সেন্টার থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করা হয় এখানে। যেটি শুরু হয়েছিলো গত ১১ মে। শুরুর দিনে পরীক্ষা হয়েছিলো ৫৯টি নমুনা। এখন প্রতিদিন প্রতি শিফটে পরীক্ষা হয় ৯৪টি নমুনা। কমপক্ষে তিন শিফটে চলে করোনা পরীক্ষার কাজ। যেদিন চার শিফট কাজ হয় সেদিন ৩৭৬টি নমুনা পরীক্ষা হয়। গড়পতা প্রতিদিন পরীক্ষা হয় প্রায় তিনশ রোগীর নমুনা।

আশার কথা হচ্ছে মাঝখানে ব্যাপক আকারে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সময় শতকরা হরে পজিটিভ আসতো ৫০ ভাগের ওপরে যেটি এখন ২৫ ভাগের কমবেশীতে নেমে এসেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানলে দ্রুত এটি নিয়ন্ত্রনে আসতে পারে।

নোয়াখালী আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের এই ল্যাবের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন তিন সদস্যের কমিটি। অধ্যাক্ষ অধ্যাপক মোঃ আব্দুছ ছালাম, সহকারি অধ্যাপক ডাঃ ফজলে এলাহী খান, সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মাহবুবুর রহমান। মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. দিপন চন্দ্র মজুমদার। প্রশাসনিক কাজগুলো সমন্বয় করছেন মোহাম্মদ হক পারভেজ। এগুলো দাপ্তরিক কথা। তবে; সার্বিক বিবেচনায় এই ল্যাব স্থাপন এবং এর কার্যক্রম নিয়ে ডাঃ ফজলে এলাহীর নাম সবার মুখে মুখে। ডাঃ দিপন মজুমদারও সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকেন। গভীর রাতেও তিনি ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন হরহামেশা। 

ল্যাব ইনচার্জ সঞ্জিবের দিনমান কাটে করোনা নিয়েই। থাকেন ৫ তলায়, কাজ করেন ৬ তলায়। বাইরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা কাউকে সংক্রমিত করতে পারেন এই আশংকায় বেরও হননা। চিন্তামুক্ত থাকতে নিজের পরীক্ষাটুকুও করিয়ে রেখেছেন ¯্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকা এই যুবক।

করোনাকালীন এই সময়ে সঞ্জিব প্রতিথযশা কেউ হলে তাঁর পোস্টগুলো কিংবা তাঁকে নিয়ে দেওয়া পোস্টগুলো ভাইরাল হতো। অথচ; আমাদের গণমাধ্যমে অলক্ষ্যেই থেকে যায় এমন কাজগুলো। কারণ নামডাকওয়ালাদের নিয়েই গণমাধ্যমের ব্যাস্ততা বেশী। তবে; স্বাচিপের জেলা সভাপতি ডা. ফজলে এলাহী খান এনাম কার্পণ্য করেনি মলিকুল্যার ল্যাবের কর্মীদের পাশে থাকতে।

কথা হচ্ছিলো কর্মসহিষ্ণু সঞ্জিব পালের সাথে। কাজ এবং দেহদানের বিষয়টি দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতেই জানালেন- সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই ল্যাবে যারা কাজ করেন কিংবা নানা ভাবে তত্বাবধধান ও সহযোগীতা করছেন প্রতিটি ব্যাক্তির প্রতি প্রচন্ডরকমের শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় তাঁর কন্ঠে। স্রষ্টার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভুলেননি তিনি।

“কাজ ফেলে রেখে ঘুম আসে না” তাই চার শিফট হলেও সবাই মিলে নমুনা পরীক্ষার কাজগুলো যতটুকু সম্ভব শেষ করে যেতে চাই। ঈদের দিন সবচে বেশী কষ্ট করতে হয়েছে। তবুও কোন ক্ষোভ নেই, শুধু আকুতি মানুষ যেনো একটু সচেনত হয়ে চলে। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সমাজের জন্যই প্রতিটি ব্যাক্তির এমন সচেতনতা জরুরী। যতক্ষণ বাঁচেন কাজ করতে চান, মরে গলে অন্তত যাতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে কিছুটা হলেও ভাগিদার হতে পারেন সেজন্যই দেহ দানের সিদ্ধান্ত। আশীর্বাদ চাইলেন সবার যেনো কাজ (সেবা) করে যেতে পারেন।

মন্তব্য লিখুন :