করোনা প্রতিরোধে ঐতিহ্য, লোকায়ত চিকিৎসা এবং বাজার

ঘড়ির কাঁটার সাথে তালমিলিয়ে ছুটে চলে নিউইয়র্কের জনজীবন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিস্কার যেখানে সহজলভ্য সেখানে লোকায়ত চিকিৎসা জ্ঞান কিংবা ওষুধ হিসাবে ভেজজের ব্যবহারের সময় কোথায়? ত্বকের যত্নে ভেষজের ব্যবহার করলেও খাবার হিসাবে গ্রহণে ছিলো ঠিক উল্টো। করনো প্রতিরোধের এই সুযোগে পুঁজি আর বাাজর ফিরিয়ে এনেছে প্রাকৃতিক উপাদানকেই।  শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে  চিরায়ত প্রাকৃতিক উপাদান, লোকায়ত চিকিৎসা জ্ঞান নিয়ে লিখেছেন রুদ্র মাসুদ


নিউইয়র্কের সুপার সপে সবুজ আমপাতা বিক্রি হচ্ছে প্রতি পাউন্ড ৪ ডলারে। আর নিম পাতা দুই কাঠি এক ডালারে। করেনা উপসর্গ তাড়াতে ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠির মানুষ কিনছে এই পাতা। আমপাতায় রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। করোনার সবচে গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা, হাঁপানি ও অ্যাজমা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একইভাবে নিমের কদর অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে। নিম ছত্রাকনাশক হিসেবে, ব্যাকটেরিয়া রোধক হিসেবে, ভাইরাসরোধক হিসেবে, ব্যথামুক্তি ও জ্বর কমাসেহ নানান রোগের ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

একই অবস্থা আদা এবং রসুনের ক্ষেত্রেও। এপ্রিলের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে করোনার ছোবল যখন ভয়াবহ তখন এ’দুটির দামও ছিলো আকাশচুম্বি। এক্ষেত্রে নিউইয়র্ক এবং নোয়াখালী’র কোন পার্থক মেলানো ছিলো দুস্কর। কারণ রসুন হার্টের জন্য, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনসহ অগণিত রোগের মহাঔষধ। একই সাথে আদা হাঁপানি, ঠান্ডাজণিত, জ্বর, হৃৎপিন্ডের সমস্যা নিবারণসহ অগণিত রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। লেবুসহ ভিটামিন-সি রয়েছে এমন ফলে কিনতেও ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। 

করোনা ভাইরাস ঠেকাতে দুনিয়া যখন ব্যস্ত ভ্যাকসিন তৈরীতে বাজার ব্যবস্থা আর পূঁজির অপূর্ব সম্মিলনীতে মানুষের সামনে হাজির হচ্ছে তখন লোকায়ত চিকিৎসার এসব উপকরণ। মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়াতে এবং করোনার উপসর্গ সারিয়ে তুলতে কারখানায় উৎপাদিত ওষুধের চেয়ে শাক-সব্জি, ফলমূল এবং ভেষজ উপাদানগুলো ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে বেশী। যুক্তরাষ্ট্রের জনহপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন ২০১৪ সালের ৮ জুলাই তাঁদের প্রকাশনায় “খাবার পছন্দে পরিবর্তন আনুন এবং রোগের সাথে লড়াই করার জন্য দেহের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলুন” শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশ করে। নিবন্ধে খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। যেটি আপডেট করা হয় করোনাকালীন সময়ে। 

তাহলে কি বাজারই আবার আমাদের ফিরিয়ে নিয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতি, লোকায়ত জ্ঞান ও চিকিৎসার ব্যাবহারে। যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে যতোকিছুর কথা বলা হয়েছে সবকিছুই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত, কারখানায় নয়। খুব বেশীদিন আগের কথা নয় যখন মানুষ যেকোন অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দিলে ফলমূল, শাক-সব্জি, মসলাজাতীয় উপাদান, ভেষজ তথা লতা-পাতা দিয়ে প্রাথমিক কাজটা সেরে নিতেন। এই লোকায়ত জ্ঞানই ছিলো প্রাথমিক চিকিৎসক আর খাবার, প্রাকৃতিক-ভেষজ উপাদানগুলো হচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরীতে কার্যকর ওষুধ।

বংশ পরম্পরায় পরিবারে চর্চা ছিলো কোন প্রাকৃতিক উপাদানে কি উপকার সেটি। যা নিজস্ব ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অংশ হিসাবেই বিচার্য ছিলো। কিন্তু ফাস্ট ফুড, সুপার মার্কেট, অনলাইন শপিং, সময় সাশ্রয়, ফ্যাশন, শরীরকে কস্ট না দেওয়া, অর্থের যথেচ্ছা ব্যবহার, নৈতিক শিক্ষার দূর্বলতা, বিজাতীয় সংস্কৃতি হিসাবে প্রচার করে এড়িয়ে চলা, অতিপ্রগতিবাদী এবং ধর্মীয় কথিত রক্ষণশীলদের বাড়াবাড়িসহ অসংখ্য কারণে পরিবারগুলোতে এটি চর্চা কমে আসে। ক্রমেই মানুষ খাবারের পরিবর্তে ওষুধ নির্ভর হয়ে পড়ে। মৌসুমী রোগের জন্য কার্যকর ওষুধ হচ্ছে মৌসুমী ফল- একথাও আমরা ভুলতে বসেছি।

পাঁচ বছর ধরে নিউইয়র্কে বসবাসকালে দেখছি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠির লোকাজ জ্ঞানে প্রখরতা। যা খুব একটা চোখে পড়েনি বাংলাদেশীদের মাঝে। নিউইয়র্কের বড় বড় সুপার স্টোর থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র গ্রোসারিতেও দেখেছি স্ব স্ব সংস্কৃতির মানুষের জীবনাচারের সাথে জড়িত খাদ্যসামগ্রী, প্রাকৃতিক-ভেষজ উপাদানগুলোর পসরা। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বাংলাদেশী গ্রোসারীগুলোতে নানান জাতের সব্জি দেখেছি, যেমনটি দেখতাম গ্রামের হাঁট-বাজারে। তবে; নিউইয়র্কের বাজারে এসবের ক্রেতা হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালীরাই বেশী। 

মানুষ এসকল বিষয়ে বিস্মৃত হলেও পুঁজি তথা বাজার ঠিকই তা খুঁজে সামনে নিয়ে আসে। কোথায় কিসের চাহিদা সেটি যেমন নিরূপন করে তেমনি মানুষকেও প্রলুব্ধ করে। আবেগী মানুষ দুইদিন আগেও যেটিকে কুসংস্কার বলেছে, মুহুর্তেই সেটি নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এখানেই বাজার আর পুঁজির সাফল্য। তাই নিজস্ব সাংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তথা লোকায়ত জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে এবং চর্চা বাড়াতে হবে পরিবার থেকে পরিবারে।

করোনা চলে গেলেই সবশেষ নয়। আপনি আপনার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে তাই নির্দিষ্ট সময় নয় প্রাত্যহিক জীবনে খাবার তালিকায় পরিবর্তন শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়ক।  নানান তথ্য খুঁজতে আমরা যেমন গুগলে হুমড়ি খেয়ে পড়ি তেমনি এই খাবার ও প্রাকৃতিক উপাদানগুলো সম্পর্কেও অনলাইনে বিস্তারিত সহজলভ্য। পরিবারের বয়োজেষ্ঠ্য সদস্যেরাও সেই তথ্য ভান্ডার। বিনে পয়সায় সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত জ্ঞান খরছ করে নিজেকে সুস্থ রাখতে না পারলে অজুহাত খুঁজে বাজার আপানার পকেট কাটবে। তখন শুধু বাড়তি পয়সাই গুনতে হবে না, অপ্রতুল সময়ে নিজেকে রোগ থেকে ঝুঁকিমুক্ত করতেও পারবেন না।

নিজের প্রয়োজনে আপনার সামান্য জমিতেও প্রয়োজনী ফল, সব্জি কিংবা ভেষজের আবাদ করতে পারেন। নাগালে রাখতে পারেন প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক ওষুধ। বাজার থেকে সব্জি কিংবা ফল কেনার সময় স্বাদের পাশাপাশি ওষুধি গুনাগুনের প্রতি লক্ষ্য রাখলে একসাথে দুটো উপকার হতে পারে।


মন্তব্য লিখুন :