বিভীষিকাময় রাত ও একজন নারী

বড় ভাইয়ার বন্ধুর সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। এটা শুনার পর থেকে রানুর মনের মধ্যে ভয়, শংকা, আনন্দ সবমিলিয়ে মিশ্র একধরণের অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছে। কতো কথা যে মাথার মধ্যে খেলা করছে। আচ্ছা, ভাইয়ার বন্ধুটা দেখতে কেমন? মন মানসিকতাই বা কেমন? বিয়ের পর তাদের দুজনের সম্পর্কটা কেমন হবে? তারা কি একে অপরের বন্ধু হতে পারবে? নানান চিন্তায় রানু উদাসি হয়ে থাকে। কলেজ থেকে ফেরার পথে তার বন্ধুরা এনিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে থাকে। শুনেছে ভাইয়ার বন্ধুটির নাম সজল। ভাইয়া আর তিনি একই স্কুলে এবং একই কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ঢাকায় পড়াশোনা করতে চলে যান। আর রানুর ভাইয়া রমিজ ডিগ্রী শেষ করে, বাবার ব্যাবসা দেখাশোনা করেন। সজল ঢাকায় বড় কোন পত্রিকা অফিসে চাকরী করেন। রমিজ তো তার বন্ধুর নাম বলতেই অজ্ঞান। এক কথায় না কি সোনার টুকরা ছেলে। যেমন দেখতে, তেমন আচার আচরণে। 

কয়েক দিনের মধ্যেই ঘরোয়া আয়োজনে রানুর বিয়ে হয়ে গেল সজলের সাথে। দেশের পরিস্থিতি ভালো না তাই ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সজল তার বাবার একমাত্র ছেলে, তাই আশা ছিল অনেক মহা ধুমধামে ছেলের বিয়ের আয়োজন করবেন। কিন্তু; দেশে পরিস্থিতি খারাপ, তাই সেটা করা হলো না। ঢাকার পরিস্থিতিও নাকি খুবই খারাপ চলছে। ছাত্ররা আন্দোলন করছে। স্বাধীনতার আন্দোলন, সহজ সরল ছোট শহরের মানুষ এতো কিছু নিয়ে ভাবেও না তেমন। বিয়ের এক সপ্তাহ পর সজল রানুকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসলো। ঢাকায় এসে রানু তার সংসার গোছানো নিয়ে ব্যস্ত। অফিস শেষে সজল আর রানু দু’জন মিলে সংসারের জিনিসপত্র কেনাকাটা করছে। এসবের মধ্যেই দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। সজলের বাবা লোক মারফত খবর পাঠিয়েছেন সজল ও রানু যেন শীঘ্রই বাড়ি চলে আসে। রেডিও টিভিতে ঢাকার খবর শুনে তারা খুবই চিন্তার মধ্যে আছেন।

আজ সজল অফিস থেকে একটু আগে আগে ফিরেছে। তাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে। রানু চা করে এনে সজলের পাশে বসে বললো  কি হয়েছে ? তোমাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে। সজল রানুর দিকে মুখ করে বলে রমিজকে আসতে খবর পাঠিয়েছি। সে এসে তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। কিন্তু কেন? কি হয়েছে বলবে তো। রানু জানতে চায়। উদ্বিগ্ন সজল উত্তর দেয়- দেশের অবস্থা ভালো না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কারফিউ, বাড়ি বাড়ি আগুন লাগানো, আরো অনেক খারাপ খবর। এ অবস্থায় তোমার এখানে থাকা নিরাপদ না। কিন্তু তোমাকে ফেলে আমি কি করে যাব? আমার এখানে অনেক কাজ। আমি কাজ শেষ করে যতোটা সম্ভব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবো। রানুর মন খারাপ হয়ে গেলো মুহুর্তেই। সজল রানুর হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কোমল কন্ঠে বললো রানু, এ অবস্থায় আমাদের সবাইকে কিছু না কিছু বিসর্জন দিতে হবে। তা না হলে স্বাধীনতা তো এমনি এমনি আসবে না। এরজন্য অনেক মূল্য দিতে হবে। রানু অভিমানি কন্ঠে বলে আমি এতোশতো বুঝি না। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না। সজল রানুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলে- আমি তো যেখানেই থাকি, তোমাকে ঘিরেই তো থাকি। থাকি তো তোমারই মনে। রানু এবার কেঁদে দিল। সজল বলল, কথা দিলাম খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে ফিরবো।

রানু বাড়ি এসেছে প্রায় চার মাস হয়ে গেল এরমধ্যে সজলের কোন খবর পাওয়া গেল না। সজলের বাবা কয়েক দিন লোক পাঠিয়ে তার অফিসে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউই সজলের কোন খবর দিতে পারেনি। হঠাৎ একদিন গভীর রাতে দরজার কড়া নাড়ার শব্দে সবাই জেগে ওঠল। সজলের বাবা এসে দরজা খুলে দেখে সামনে সজল দাঁড়িয়ে আছে। তিনি সজলকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। এতোদিন কোথায় ছিলি? কোন খবর দিসনি কেন? বাবারে আমরা চিন্তায় অস্থির হয়ে আছি। একনাগাড়ে বলে চলেছেন তিনি। সজলের মা ও কাঁদছেন। রানু এসে দাঁড়িয়েছে মায়ের পাশে। সজল মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে পাশে দাঁড়ানো রানুকে দেখে বলল রানু মা হবে? আমি বাবা হবো। সবাই এক সাথে বহু দিন পরে কান্না হাসি,অনন্দ বেদনার এক মিলন মেলায় উদ্ভাসিত হলো। পরের দিন দুপুরে খেতে বসে সবাই এক সাথে কথা বলছে। সজল বলছে বাবা আমাদের অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে। পরে আমি ইন্ডিয়া  গিয়েছি, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফিরেছি। চার পাঁচ দিনের মধ্যে আমার দলের ছেলেরা আমার সাথে যোগাযোগ করবে। আমি তাদের সাথে যুদ্ধে যোগ দিব। একথা শুনে রানু কান্না করছে। সজল বললো রানু তুমি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, তোমাকে কথায় কথায় কাঁদলে চলবে না। অনেক শক্ত হতে হবে। সজলের মা ও কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছে বাবারে তুই আমার একমাত্র ছেলে, বহু চেষ্টা সাধনায় তোকে পেয়েছি। তুই যুদ্ধে গেলে আমরা কি নিয়ে বাঁচবো। সজলের বাবা তার মাকে সান্তনা দিয়ে চুপ করতে বলে ক্ষোভের সাথে বললে যুদ্ধে না গিয়ে উপায় কি? আর তো কোন উপায় নাই। আমাদের এখানেও মিলিটারী ক্যাম্প করেছে। মোল্লা বাড়ির সুফি মোল্লা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছে। এরমধ্যে চার  পাঁচ দিন তোর খবর নিয়ে গেছে। তুই কোথায় আছিস? কি করছিস ইত্যাদি নানান প্রশ্ন করে গিয়েছে। 

এমন সময় দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হলে সজল উঠে দরজা খুলে দিল। সুফি মোল্লার সাথে আরো কয়েক জন ঘরে ঢুকলেন। সুফি মোল্লা পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললেন- তা সজল বাবা আছ কেমন? এতোদিন কই আছিলা? ইন্ডিয়া গেছনি কি? কেউ কোন কথা বলছে না। সবাই ভেতরে ভেতরে ভয়ে চুপসে আছে। সুফি মোল্লা আবার বলতে লাগলেন চল বাবা তোমারে নিতে আইলাম। মিলেটারীর অফিসার তোমার লগে কতা কইবো। সজলের বাবা উঠে এসে বললেন এখন এ সময় কিসের কথা। সজলের মা সুফি মোল্লার সামনে দুই হাতজোড় করে বললেন, ভাই গো আমার একটা পোলা আমার পোলাটারে মাফ করে দেন। সুফি মোল্লা হাসতে হাসতে বললেন, ভাবী সাব চিন্তা কোইরেন না। চইলা আইবো। এ যাইবো আর আইবো। মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন আপনি আমারে কথা দিলেন ভাই। হ কতা দিলাম। চইলা আসবো। তা সজল বাবা চল। সজল রানুর কাছে গিয়ে বললো চিন্তা করোনা, চলে আসবো। দরজা পর্যন্ত গিয়ে সুফি মোল্লা আবার ফিরে এসে রানুর পাশে দাঁড়ানো জরির দিকে তাকিয়ে বলে, তা জরি কেমন আছ? মোল্লা তার পাশে দাঁড়ানো দুই ছেলেকে বললো- তা বাবারা জরিরেও নিয়া চল। সজল প্রতিবাদ করতে গেলে তার পিঠে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে একজন বলে চুপ শালা কোন কথা না। তারপর দুইজনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এসব দেখে রানু মাথা ঘুরে পড়ে যায়।

সেদিনের পর থেকে দিন-সপ্তাহ-মাস কেটে যায় কিন্তু সজল ফিরে না। তার কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। তার বাবা মোল্লার সাথে দেখা করে সজলের খবর জানতে চেয়েছে। মোল্লা বলেন তাকে তো কিছু কথাবার্তা জিজ্ঞাস করে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সজল তো বাড়ি ফিরেনি? কোথায় সে? কোথায় গেছে? যুদ্ধে? নানান প্রশ্ন রানুর মনে। রানু ঘুমাতে পারে না। প্রতিরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে বাজে । দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে সজলকে খুঁজে । পুরা বাড়িতে কেবল কান্নার ধ্বনি, প্রতিধ্বনি হতে  থাকে। এমনি করেই দিন কাটতে থাকে। রানুর কোল জুড়ে আসে তার আর সজলের ছেলে দিপ্ত। দিপ্তর জন্ম তাদের সবাইকে নতুন আশার আলো দেখায়। তাদের সবাইকে হাসতে শেখায়, শেখায় বাঁচতে। দেশে স্বাধীনতা আসে। গোটা দেশে অভাব-অনটন,ক্ষুধা-দারিদ্রে ছেঁয়ে গেছে। রানুর কাজের মেয়ে জরি ফিরে এসেছে। সম্ভ্রম হারিয়ে জরি ফিরলে এলাকাবাসী তাকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো। তখন সজলের বাবা জরিকে নিজের বাড়ি নিয়ে আসে।  

এখানকার একটা প্রাইমারী স্কুলে রানুর চাকুরী হয়। চাকুরী সংসার সন্তান নিয়ে রানুর সময় ব্যাস্ততার মাঝে কাটতে থাকে। সময় সময়ের নিয়মে বয়ে যায়, দিপ্ত বড় হয়েছে স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়ে সেখানেই থিতু হয়েছে। রানুর শ্বশুর-শ্বাশুড়ী বার্ধক্যজনিত কারণে জীবনের পাট চুকিয়ে অনন্তের বাসিন্দা হয়েছেন। জীবদ্দশায় শ্বশুর তার সমস্ত সম্পত্তি রানুর নামে লিখে দিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন রানু বড্ড ক্লান্ত, সময় যেন তার কাটতে চায় না। নতুন করে যেন সব কিছু হারিয়ে ফেলেছে। বুকের ভিতর শূণ্যতা বিরাজ করে। 

কয়েক দিন ধরে রানুর মাথায় একটা আইডিয়া কাজ করছে। তার বড় ভাই রমিজকে খবর পাঠিয়েছে। সে আসলে পরামর্শ করে একটা সিদ্ধান্ত নিবে। রমিজ  তার বোনের সিদ্ধান্তে এক কথায় রাজি হয়ে যায় এবং এ কাজে তাকে শতভাগ সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। যাতে পুরো কাজটা রানু সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারে। কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা কাজ শুরু করে দেয়। কাজ শুরুর পর প্রথমে এলাকার কিছু মাতব্বর শ্রেণীর লোক বাঁধা দিয়েছে। সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে অবশেষে তারা পরিকল্পনামতো “বীরঙ্গনা হোম” এর কাজ সম্পন্ন করেছে। জরিকে দিয়ে এই হোম উদ্বোধন করা হয়েছে। এখন সেখানে ৪০ জন বীরঙ্গনা বসবাস করছেন। রানু কিংবা জরির কাছাকাছি  বয়সের হলেও তারা সকলেই কিছুনা কিছু কাজ করছেন। কেউ সেলাই, কেউবা হাঁস মুরগির খানার, কেউ ফুলের চাষ, ইত্যাদি নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে রানু আর রমিজ মিলে হোম’র সবকিছু তত্বাবধান করছেন। হামাগুড়ি দিতে দিতে এখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস বীরাঙ্গণাদের এই ছোট্ট পরিসরের আবাস ‘বীরাঙ্গনা হোম’। সারাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর রাখেন এমন গবেষক, তরুন-যুবকরা এখানে আসেন বীরাঙ্গনাদের সাথে কথা বলতে, তাঁদের সম্মান জানাতে। স্বাধীনতার জন্য তাঁদের ত্যাগকে আগতরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তবে ডিসেম্বর এবং মার্চে পদচারণা থাকে বেশী। 

ইদানিং রানুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বয়স হয়েছে, আগের মতো ছুটতে পারে না। জরি সবসময় তার সাথে ছায়ার মতো থাকে। দিনটা কোনমতে কেটে গেলেও রাতটা বড় দীর্ঘ মনে হয়, কিছুতেই কাটতে চায় না। মায়ের খোঁজ নিতে বিদেশ থেকে রোজ ফোন  করে খবর নেয় দিপ্ত, মনে হয় কাছেই আছে। মা’র প্রতি, বীরাঙ্গনা হোম, দেশের প্রতি ছেলের টান দেখে রানু আপ্লুত হয়। তবে; ইদানিং পুরাতন রোগটা আবার দেখা দিয়েছে। রাত গভীর হলে দরজার কড়া নড়া শুনতে পায় ,আর দরজা খুলো সজলকে খুঁজে। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে সজল তুমি ফিরে আসবে। তুমি আমাকে বলেছ, তুমি আসবে। এসব দেখে রানুকে জড়িয়ে ধরে জরি বলে আপা এতো বছর পরও? তারপর দুজন জড়াজড়ি করে কাঁদতে থাকে। এভাবে প্রায়শই ঘটছে। কিন্তু; সজল ফিরেনা আর, প্রতিটি রাত তাঁর কাছে বিভীষিকাময় মনে হয়। প্রকৃতির নিয়েমেই ভোর হয় সজলের আশায় পথ চেয়ে থাকে রানু। তাঁর কানে বাজে সজলের শেষ কথা- ‘চিন্তা করোনা, চলে আসবো’। 


ইয়াছমিন মুক্তা

কবি-লেখক, নিউইয়র্ক।


মন্তব্য লিখুন :