প্রজন্ম সংলাপে নারীর জন্য নিরাপদ সুবর্ণচর গড়ার শপথ

নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং গণসচেতনতা

নারীর প্রতি সহিংসতা হয়রানির মূল কারণ মানুষের বিকৃত মানসিকতা। এর পিছনে অন্য কোন কারণ থাকতে পারে না। এটি এখন একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। আর এই সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ে আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে নারীর অর্থনৈতিক শিক্ষাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সচেতনতা।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উপলক্ষ্যে সোমবার দুপুরে উপজেলার সৈকত সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে আমরা’ শীর্ষক এক প্রজন্ম সংলাপে এসব কথা বলেন অতিথিও অংশগ্রহণকারীরা এতে তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী, জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় পাঁচশতাধিক মানুষ নারীর জন্য নিরাপদ সুবর্ণচর গড়ার শপথ নেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উপলক্ষ্যে একশনএইড বাংলাদেশ, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ) ও সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। 

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে এই অঞ্চলে সংঘঠিত ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরণের সহিংসতার ঘটনা দেশব্যপী ব্যাপকভাবে আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সংলাপটি চলমান এই সহিংসতার কারণ, করণীয় এবং স্থানীয় জনগণ ও সেবাপ্রদানকারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে একটি সমন্বিত  পথনকশা।  

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন স্থানীয় সমাজকর্মী মাসুদ। তিনি বলেন, গত জুলাই মাসে ৬টি জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় পত্রিকার সংবাদের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ৭১টি সহিংসতার ঘটনার ১৫. শতাংশই ঘটেছে সুবর্ণচরে। এছাড়া গেল মাসেও সুবর্ণচরে বিভিন্নভাবে বেশকিছু নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং তা বিভিন্ন  সংবাদপত্রে সংবাদও প্রকাশিত হয়। যা বিভিন্ন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের ঘটনা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন বলেন তিনি। 

এসময় সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম ইবনল হাসান ইভেন বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে নারী নির্যাতনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে অশিক্ষা এবং দারিদ্র্যতা। বাল্য বিবাহ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শিক্ষার হার বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা অবশ্যই প্রয়োজন্। বিশেষ করে প্রয়োজন নারীর উন্নয়ন ক্ষমতায়ন এছাড়া সর্বস্তরে মানসিকতা পরিবর্তনে প্রয়োজন পারিবারিক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ শুধুমাত্র শাস্তির মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি রোধ করা সম্ভব নয়।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সালমা সুলতানা বলেন, নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না, এমনকি এখনও না। সকলের অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতার মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব হবে।         

এই প্রজন্ম অনুষ্ঠানে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। এসময় অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে বলা হয়, নোয়াখালীতে এমনও এলাকা আছে যেখানে বাড়িতে যদি পুরুষ না থাকে তাহলে নারীরা সহিংসতা হয়রানির শিকার হন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের মানসিকতার সমস্যা রয়েছে। এছাড়া সহিংসতার শিকার নারীর অভিযোগ নেয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের অনিহা দেখা যায়। এমনকি রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যও দেখা যায়। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রশাসনের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। 

নোয়াখালী জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার দীপক জ্যোতি খিসা বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনকে সহযোগিতায় সাধারণ জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। তবে শুধুমাত্র আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব না। আইনের পাশাপাশি সামাজিক মনোগত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

অনুষ্ঠানের আগত তরুণ সদস্যরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরেন। জানতে চান বাল্য বিয়ে বন্ধে করণীয় সম্পর্কে। তারা বলেন, শারীরিকভাবে সহিসংতা ছাড়াও পথেÑঘাটে চলার সময় নারীদের বিভিন্নভাবে অশ্লীল ভাষার মাধ্যমে হয়রানি করা হয়। আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের সম্মান দিতে জানতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, পোশাক নয়, নিচু মন-মানসিকতার কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতা হয়। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করা দরকার। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিগুলো সক্রিয় করার প্রয়োজন বলে মনে করে তরুণরা। আমরা চাই সকলের সহযোগিতায় নারী বান্ধব হয়ে উঠবে নেয়াখালীর সুবর্ণচর।

একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, আমাদের একে অপরকে মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে হবে। আমরা এখনও চিন্তা করি যে নারীর কাপড়ের কারণে সহিংসতা হয়। এমন চিন্তা করার এখন আর সময় নেই। এখন চিন্তা করতে হবে আমরা কেন এমন চিন্তা করি। তিনি বলেন, যে সমাজে নারী পুরুষ শান্তিভাবে থাকতে পারে সেই সমাজেই শান্তি থাকে। ধর্ষণের শিকার নারীকেই আমরা দোষ দেই। পার পেয়ে যায় ধর্ষণকারী। ধর্ষণকারীকে আমরা গ্রহণ করি বলেই আমাদের এই অবস্থা। যারা হয়রানিমূলক আচরণ করেন তারা নিজেদের হীনমন্যতা লুকাতে এধরনের আচরণ করে। এধরনের আচরণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের আহবা জানান তিনি।

নোয়াখালী জেলার জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস বলেন,বর্তমান প্রজন্ম নানা ধরণের সমস্যা সহিংসতার সম্মুখীন যেমন হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের কাছেই রয়েছে সময়োপযোগী সমাধান। তিনি বলেন, সহিংসতা রোধের শুরু হতে হবে ঘর থেকেই। নারীর প্রতি আচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান পারিবারিক শিক্ষার অংশ। আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। নারীকে দেখতে হবে মানুষ হিসেবে। অপরদিকে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফলে অপরাধীরা পাড় পেয়ে যাচ্ছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

সুবর্ণচরে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে সংবেদনশীল এবং তরুণ সমাজকে সচেতন করতে এবং তাদের অভিমত জানতে এই প্রজন্ম সংলাপের আয়োজন করা হয়।

মন্তব্য লিখুন :