অতিকথনে আলোচিত বসুরহাট পৌরসভার সবকটি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ!

নানান নাটক, অতিকথন আর সত্যকথনের কারণে আলোচিত নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার নির্বাচন শনিবার। উপজেলা শহরের এই পৌরসভার নির্বাচনে মেয়র পদে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মীর্জা আব্দুল কাদেরের কারণে পুরো দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে নয়টি কেন্দ্রের সব কয়টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করে কড়া নিরাপত্তামুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে, কাউকে কোন সুযোগ দেওয়া হবেনা বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জেলা প্রশাসক।

নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসাবে কেন্দ্রের অভ্যন্তরে এবং আশেপাশের এলাকার জন্য ২২০ জন পুলিশ, চার প্লাটুন (৮০ জন) বিজিব সদস্য ও ২৪ জন র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হবে। থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স। প্রতিটি কেন্দ্রের সার্বিক দায়িত্বে থাকবেন একজন করে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটদের তত্ত্বাবধানে থাকবেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট।

এদিকে ভোটের মাঠে পারিবারিক এবং সাংগঠনিক বিরোধে বিষয় টেনে এনে আওয়ামী লীগের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মীর্জা কাদের যেমন আলোচিত। অপরদিকে সজ্জন মানুষ হিসাবে বসুরহাটের মানুষের কাছে পরিচিত বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও বসুরহাট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন চৌধুরী। এছাড়া বসুরহাটে রয়েছে দীর্ঘদিনের জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান, তাঁদের প্রার্থী মোশারফ হোসেন। ভোটযুদ্ধে কে বৈতরণী পার হতে পারেন সেটি দেখতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান জানান, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু ও শান্তিুপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যত ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তার সবটাই নেওয়া হয়েছে। কাউকে কোনো ধরণের অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সার্বক্ষনিক কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করবেন।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের লক্ষে নির্বাচনে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে বৃহস্পতিবার মভ ভোটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার দুপুর নাগাদ প্রতিটি কেন্দ্রে নির্বাচনী সরাঞ্জম পাঠানো শুরু হবে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দ আনোয়ার নাদিম জানান, বসুরহাট পৌরসভার নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের আবদুল কাদের মির্জা, বিএনপির কামাল উদ্দিন চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর মোশারফ হোসেন প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। ৯টি সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদে লড়ছেন ২৫ জন ও সংরক্ষিত মহিলা আসনে লড়ছেন নয়জন নারী প্রার্থী। পৌরসভার মোট ভোটার ২১ হাজার ১১৫ জন। এর মধ্যে ১০ হাজার ৬২১ জন পুরুষ। আর ১০ হাজার ৪৯৪ জন নারী ভোটার। কেন্দ্র নয়টি।

প্রসঙ্গতঃ গত ৩ জানুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আচরণবিধি সংক্রান্ত সভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা নির্বাচনে তার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলাসহ নির্বাচনী আচরনবিধি ভঙ্গের নানা অভিযোগ তোলেন। এছাড়া নির্বাচন বানচাল করার জন্য আশপাশ থেকে বেশ কিছু অস্ত্র শস্ত্র এলাকায় কতিপয় ব্যাক্তির যোগসাজসে আনার অভিযোগ করেন। অবাধ সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে কি কি সমস্যা বিরাজমান   তা নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট   তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেন এবং অপকর্মের পিছনে যারা যারা জড়িত  সভায় তাদের নাম প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ করেন। বক্তব্যে তিনি সেতু মন্ত্রীর স্ত্রী, একরামুল করিম চৌধুর এমপি, নিজাম হাজারী এমপিসহ কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তখন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে কথা বলার অনুরোধ করলে সভাস্থল ত্যাগ  করে সমর্থকদের নিয়ে মীর্জা কাদের বসুরহাটে সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেয়। পরে  বিকাল ৫টার দিকের জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিমের অনুরোধে সমর্থকদের নিয়ে অবরোধ তুলে নেন তিনি।

এরপর থেকে প্রতিদিন তিনি নতুন নতুন বক্তব্য দিয়ে গণমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হন। তাঁর বক্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। নির্বাচনে কোন ধরণের অনিয়ম কিংবা সহিংসতার জন্য সেতুমন্ত্রী দায়ী হবেন বলেও তিনি হুশিয়ারি করেন। ভোটের মাঠে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে বলে রীতিমতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হিতাকাংঙ্খিতে পরিণত হন। একইসাথে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবীর কারণে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও প্রসংশা কুড়ান।

নির্বাচনে নিরপত্তার বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জাহেদুল হক রনি বলেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় নয়টি কেন্দ্রের সব কয়টিকেই তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ কারণে ভোট গ্রহণের দিন প্রতিটি কেন্দ্রের ভেতর একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে পাঁচজন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্র কেন্দ্রিক একজন পরিদর্শকের নেতৃত্বে আট সদস্যের পুলিশের একটি টহল দল থাকবে। তারা কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি প্রতি তিনটি কেন্দ্রের জন্য একটি করে ষ্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। ভোট গ্রহণ চলাকালীন র‌্যাবের তিনটি এবং বিজিবির তিনটি দল সার্বক্ষনিক টহল দিবে। তা ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রম তদারকির জন্য একজন করে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানই তাঁর প্রধান দাবী। তিনি এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনে একটা নজির স্থাপন করতে চান। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের ব্যপারেও তিনি শতভাগ আশাবাদী। এরপরও যদি নির্বাচনে তিনি হেরে যান, তাতেও আপত্তি নেই। প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে নেতা-কর্মীদের নিয়ে মিষ্টি খেয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন।

বসুরহাট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপির প্রার্থী কামাল উদ্দিন চৌধুরী এ প্রতিনিধিকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু পর থেকে এ পর্যন্ত পরিবেশ চমৎকার ছিল। প্রচারণায় কোথায়ও কোনো বাধার সন্মূখীন হতে হয়নি। তা ছাড়া সরকারি দলের প্রার্থীর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাসের কারণেই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বলে উল্লেখ করে বিএনপির প্রার্থী বলেন, সুষ্ঠু ভোট হলে জয়ের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী।


মন্তব্য লিখুন :